সমকামিতার কথা স্বীকার করে বিবৃতি দিল খ্রিষ্টান যাজক

0
27

জানুয়ারি ২৪, ২০২০ | অনলাইন ডেস্ক

গির্জার বিভিন্ন যাজকদের যৌন কেলেঙ্কারী কোনো নতুন বিষয় নয়। এসব খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের যৌন অপরাধের কথা শানা যায়। যদিও বেশিরভাগ সময়ই এসব অভিযোগ সামনে আসেনা, গোপনই থেকে যায়। কিন্তু ৯২ বছর বয়সে এসে নিজের সমকামিতার কথা স্বীকার করে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন ভারেন্ড স্ট্যানলি আন্ডারহিল নামের এক যাজক। এক প্রতিবেদনে সেই যাজকের সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার কথাই তুলে ধরেছে বিবিসি বাংলা।

আন্ডারহিল মনে করেন, ‘আমি সমকামী হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলাম। এটি আমি নিজে পছন্দ করে নেইনি। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই এটি আশা করেছি যে আমি যদি বাদি সবার হতো হতাম।’

অনেক অল্প বয়সেই তিনি অনুধাবন করেন যে তিনি ঠিক তার বয়সী অন্যদের মতো না। ‘আমি আমার ভাইকেও ২০১৮ সালে বই লেখার আগ পর্যন্ত বলিনি যে আমি সমকামী,’ তিনি বিবিসিকে বলেন।

এই সময় তার বয়স ছিলো ৯১ এবং তার ভাই তার চেয়ে দু বছরের ছোটো। আর তার মুখে একথা শোনার পরও খুব একটা উদ্বিগ্ন হননি তার ভাই। অনুশোচনায় দগ্ধ আমি যদি তাকে ও আমার পরিবারকে আগেই বলতে পারতাম। অবশ্য আমি জানিনা তারা বিষয়টা তখন কিভাবে নিতো।’

নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, তিনি বড় হয়েছেন একটি সমস্যাসঙ্কুল ও অসহিষ্ণু পরিবেশে যেখানে দারিদ্রতা, শ্রেণি বৈষম্য আর মতামত চাপিয়ে দেয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক চিত্র। এসব কারণে তিনি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন তখন নিজেকে অন্যদের মতো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ আছে এমন একজন হিসেবেই উপস্থাপন করেন।

ভারেন্ড স্ট্যানলি আন্ডারহিলের জন্মের মাত্র নয় বছর আগে ১৯১৮ সালে ইংল্যান্ডে ভোটাধিকার পায় নারীরা। তার সমকামী হওয়াটা ছিল বেআইনি ও এটিকে ‘ঈশ্বরকে অসম্মান’র সাথে তুলনা করা হতো। ফলশ্রুতিতে অন্য অনেকের মতো আন্ডারহিলও তার সেস্কুয়ালিটি বা যৌন বৈশিষ্ট্য গোপন করেন।

শৈশবে আন্ডারহিল খুবই নার্ভাস ধরনের ব্যক্তি ছিলেন এবং তার অভিভাবক ছিলেন অনেক রক্ষণশীল। সেখানে নিজের সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তার বাবা একটি কারখানায় কাজ করতেন যেখানে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি করা হতো কিন্তু তার বেতন ছিল খুব কম। বাবার সাথে তার সম্পর্ক ছিল অনেকটা নির্দেশনা বা আদেশ নিষেধ শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মায়ের সাথেও তার ঠিক স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না আরও ভয়াবহ হলো স্কুলে প্রায়শই তাকে টিটকারি বা হয়রানির শিকার হতে হতো।

আন্ডারহিলকে ডাকা হয় তার চিকিৎসার জন্য কিন্তু তিনি সেখানে অনেক রক্ত দেখে অজ্ঞান হয়ে যান। পরে অ্যালেক্স নামক একজনকে ডাকা হয় তার শুশ্রূষার জন্য। চোখে খুলেই দেখেন অ্যালেক্স তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর এভাবেই একজন পুরুষের প্রেমে পড়েন আন্ডারহিল।

১৯৪৮ সালে নেভিতে তার চাকরিশেষে তিনি অ্যালেক্সের বাবার কাছ থেকে বেতনহীন হিসাব রক্ষকের ক্লার্ক হিসেবে কাজের অফার পান। কিন্তু আন্ডারহিল যখন অ্যালেক্সের সাথে এক সাথেই থাকতে চাইলে তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এটি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অ্যালেক্সের বাবা তাকে কাজ ছেড়ে দিয়ে নিজের পথ দেখতে বললেন। আবার অ্যালেক্সের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা গেলো।

আন্ডারহিলের সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থাতেই এক নারীর সাথে প্রেম শুরু করে অ্যালেক্স। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ সালে সে তার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করে। এতে খুব কষ্ট পান আন্ডারহিল। এটা তাকে নৈরাজ্যের মধ্যে ঠেলে দেয়। অ্যালেক্স তখন বন্ধুকে সারাতে এগিয়ে আসেন। আন্ডারহিলকে তিনি কনভারসেশন থেরাপির পরামর্শ দেযন। এক সকালে সে একদল বন্ধুকে ডাকে এবং তার হাতের ওপর হাত রেখে প্রার্থনা করতে বলে।

তার কথা মেনে নেন আন্ডারহিল। কিন্তু এর ফল ছিল একটা বিপর্যয়। ‘আমার খুবই খারাপ অনুভূতি হতে লাগলো যা আগে কোনদিন হয়নি। আমি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বললাম এ বিশ্বের জন্য আমি ভালো নই।’

এরপর তিনি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন ও তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। এমনকি তাকে ইলেক্ট্রো শপ থেরাপিও দিতে হয়। আন্ডারহিল নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করেছেন। এমনকি রাস্তাঘাটে তরুণদের দিকে তাকানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নিজের যৌন আচরণ পরিবর্তনে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন কিন্তু পারেননি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। তিনি তার বাড়ি বিক্রি করে কিছু সময়ের জন্য মায়ের কাছে ফিরে যান।

১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সমকামিতাকে অপরাধের সংজ্ঞার বাইরে আনা হয়। এমনকি এখনও ৬৮টি দেশে সমকামিতাকে কিছু মাত্রায় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অর্ধেকই একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যে ছিলো। আন্ডারহিলকেও টেস্টসটেরন হরমোনাল ইনজেকশনও নিতে হয়। কিন্তু এটি তার যৌন বিষণ্ণতাই বাড়িয়ে দিয়েছিলো কেবল।

পরে তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে তিনি বহু সমকামী ব্যক্তিকে খুঁজে পান এবং আন্ডারহিল তাদের সাথে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করতে কঠিন পরিশ্রম করেন। পরে তিনি একটি অ্যাকাউন্টেন্সি ফার্ম এর অংশীদার হন এবং সেখানেও তার সেক্সুয়ালিটি একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। তখনকার তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারা প্রতি পদক্ষেপে আমাকে নিয়ে উপহাস করতো কারণ আমি একজন সমকামী। সে কারণে সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং ধর্মযাজক হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নের দিকে মনোযোগী হই।’

আন্ডারহিল ভুল ব্যাখ্যাকেই সব সমস্যার মূল বলে মনে করেন। তিনি সানডে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই যিশুকে রোল মডেল মনে করেন।

তিনি কেন্টারবুড়ি স্কুল অফ মিনিস্ট্রিতে তিন বছর পড়াশোনা করেন যাজক হওয়ার আশায়। এমনকি কয়েকটি জায়গায় কাজ করেন নিজের সমকামী পরিচয়কে গোপন রেখেই। তিনি বইয়ে লিখেছেন চার্চ কর্তৃপক্ষের হিপোক্রেসির জন্য তিনি সেটি বলতে পারেননি। তিনি লিখেছেন, সমকামীদের প্রতি যিশুর মতো সহনশীলতা দেখানোর সুযোগ চার্চ হাতছাড়া করেছে।

এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন লন্ডনে এবং সমকামীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোয় দারুণ খুশি তিনি। তার ভাষায়, ‘অবশেষে এটাই মুক্তি। আমি দুঃখ পাই এ কারণে যে আমি আমার স্বাভাবিক যৌন জীবন থেকে বঞ্চিত যা আমার জন্য চরম হতাশার কারণ হয়েছিল।’



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে