মৃত্যু আসন্ন জেনেও ভালোবাসা দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন দম্পতি

0
101


মৃত্যু আসন্ন জেনেও ভালোবাসা দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন দম্পতি

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: করোনা ভাইরাস যেন এক আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি চীনে করোনা ভাইরাস প্রাণ নিয়েছে এক হাজার ৮৬৮ জনের। আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭২ হাজার ৪৩৬ জনে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মী। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনকে নিষিদ্ধ করেছে। বলতে গেলে একঘরে হয়ে পড়েছে চীন।

তবে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা আলাদা করতে পারেনি তাং হাই এবং টিং লি দম্পতিকে। চীনের তাং হাই জীবন সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসার অনুপম এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সংক্রমণের ভয় না পেয়ে বরং দিন-রাত আক্রান্ত স্ত্রীর সেবা করে চলেছেন তাং হাই। একটা মুহূর্তের জন্যে স্ত্রীকে চোখের আড়াল করছেন না তিনি। ভালোবাসার মানুষটি যাতে ভেঙে না পড়েন, সেজন্যে অসম্ভব একটা যুদ্ধে নেমেছেন তিনি।

যুগে যুগে পৃথিবীতে ভালোবেসে অমর হয়েছেন অনেকেই। আবার ভালোবেসে তাদেরকে আদর্শও করেছেন অনেকে। শিরি-ফরহাদ, লাইলি-মজনু বা রোমিও-জুলিয়েটের কথা তো ইতিহাস মনে রেখেছে। এবার ইতিহাস সাক্ষী হতে চলেছে নতুন এক ভালোবাসার গল্পে। চীনের উহান শহরে তাং হাই এবং টিং লি’র সুখের সংসার ছিল। তাং হাই একজন চলচ্চিত্র পরিচালক। আর উহানের এক হাসপাতালে টিং লি নার্সের চাকুরি করেন। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। ঘর আলো করে আসে এক রাজপুত্র। সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে ছেলেটি।

সুখের সংসারে হঠাৎই হানা দিলো করোনা নামের কালো মেঘ। উহান শহরটা যখন করোনার আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে, ঠিক তখন টিং লি’র ডাক এলো করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে। তাকে যেতে হবে হাসপাতালে করোনায় আক্রান্তদের সেবায়। স্ত্রী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন, এটা জেনেও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ার্ডে শেষ বিদায় জানিয়ে এসেছিলেন তাং হাই।

সপ্তাহ দুয়েক পরে খবর পেলেন অসুস্থদের সেবা করতে গিয়ে টিং লি নিজেই করোনাভাইরাসের কবলে পড়েছেন। তখন ভয় পেয়ে দূরে সরে যাওয়ার পরিবর্তে স্ত্রীকে আগলে রাখার পথেই হাঁটলেন তাং হাই। হাসপাতালে ভর্তি না করে তাকে নিয়ে এলেন বাসায়। ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন তার নানীর কাছে। যাতে করোনা তাকে গ্রাস করতে না পারে। তারপর একটা অসম্ভবপ্রায় যুদ্ধ শুরু করলেন তাং হাই।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে কমপক্ষে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন পিরিয়ডে রাখা হয়। হাসপাতালের পরিবর্তে নিজেদের বাড়িতেই প্রোটেটিভ স্যুট পরে সেটা শুরু করলেন তাং হাই। নিজে সারাদিন ভারী প্রোটেক্টিভ স্যুট পরে থাকছেন, মুখটা ঢেকে রাখছেন মুখোশে। টিং লি স্বামীকে অনেকবার বলেছেন, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে। নিজেকে নিয়ে এসব ঝামেলা দেখতে তার ভালো লাগছে না।

তবে টিং লির কোনো কথাই পাত্তা দেন নি তাং হাই। তিনি জানেন, এই মুহূর্তে স্ত্রীর পাশে থাকাটা দু’জনের জন্যই খুব প্রয়োজন। তার উপস্থিতি টিং লি’কে খানিকটা হলেও ভালো থাকতে, আরেকটু জোর লড়াই করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। দিনগুলো ভীষণ একঘেয়ে হয়ে যায়। ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। তাং হাইও সারাদিনই বাসায় থাকেন, স্ত্রীর পছন্দের আইটেমগুলো রান্না করেন, তাকে খাইয়েও দেন। গল্প করেন দু’জনে, মাঝে একটা নিরাপদ ব্যবধান থাকে।

স্ত্রীকে চকলেট গিফট করেন তাং হাই, বাইরে গিয়ে ফুল কিনে নিয়ে আসেন। নিয়ম করে ঘর পরিষ্কার করেন। প্রতিদিন প্রোটেক্টিভ স্যুট বদল করেন। স্ত্রীর ব্যবহৃত জামা-কাপড় আর মাস্ক ফেলে আসেন ময়লা ফেলার নির্ধারিত বাক্সে। তাং হাই প্রতিদিন স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন। তাকে যাতে করোনাভাইরাস আক্রমণ করতে না পারে। মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না, তার ভয় একটাই- তিনি বিছানায় পড়ে গেলে স্ত্রীকে দেখার কেউ থাকবে না। টিং লি ভেঙে পড়বেন, নিজেকে সামলাতে পারবেন না আর।

ভিডিওকলে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন দু’জনে, বাচ্চাটাকে বুঝতে দেন না যে তার মা মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা এক ঝড় এলোমেলো করে দিয়েছে এই দম্পতির জীবনকে। সেই ঝড়ের আঘাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে তারা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছেন একে অপরকে। দু’জনে স্পর্শ সুখ থেকে বঞ্চিত অনেকদিন ধরে, হাত ধরা যায় না, চুমু খাওয়া তো অসম্ভব কিছু, একটাবার জড়িয়ে ধরতে পারেন না কেউ কাউকে। তবুও ভালোবাসার অদৃশ্য শক্তিতে তারা পাশে থাকেন পরস্পরের। প্রতিটা মুহূর্ত তাদের বন্ধনটা আরো দৃঢ় করে।

দিনগুলো ভীষণ দীর্ঘ, কাটতেই চায় না যেন। নেটফ্লিক্স, রান্না, গল্প- সবকিছু করেও যেন ফুরায় না সময়। তাই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেদের এই যুদ্ধকে ক্যামেরায় ধরে রাখার পরিকল্পনা করেন তাং হাই। ফিল্মমেকার তাং হাই ক্যামেরাবন্দী করে আপলোড করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাং হাই আরো একটি উদ্দেশ্যে এটি করছেন। তা হলো করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে উহানের প্রতিটা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইছেন তিনি।

প্রতিটা পর্বের শুরুতে তিনি স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার কথা জানান, দিনটা কেমন গেল সেটা বলেন গল্পের ছলে। রান্না, গল্প আর খুনসুটিগুলো ভিডিওর মাধ্যমে দর্শকদের জানান তিনি। নিজের ভেতরটা মুষড়ে পড়লেকও ক্যামেরার সামনে, স্ত্রীর চোখের সামনে স্বাভাবিক থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করেন তাং হাই। উহান আর চীনের আরো অনেক জায়গা থেকে হাজার হাজার মানুষ করোনার বিরুদ্ধে নিজেদের সংগ্রামের গল্পগুলো শেয়ার করেন ভিডিওর কমেন্টবক্সে। একটা মিলিত লড়াই চলে সেখানে। একে অন্যকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন প্রাণপনে।

কারো জানা নেই শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে কিনা তারা। করোনার কাছে কি হেরে যাবে ভালোবাসা। নাকি ভালোবাসার কাছে হারতে বাধ্য হবে করোনা। তবে কর্পোরেট ভালোবাসার এই যুগে আদর্শ হয়ে থাকবেন তাং হাইয়ের ভালোবাসা।



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে