এবার পেঁয়াজের ফাঁকে চাল নিয়েও চালবাজি

0
27


https://www.newstangail.com/wp-content/uploads/2019/10/received_1024712454364059.jpeg

দাম ডাবল সেঞ্চুরি পেরিয়ে তিনশ ছোঁয়ার পর্যায়ে পেঁয়াজের বাজার । প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্বাস দিয়েছিলেন।  কার্গো বিমান ভাড়া করে পেঁয়াজ আনা হচ্ছে। ওই পেঁয়াজ এলে দাম কমে যাবে। পাশাপাশি যাদের কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারির সঙ্গে আরও কিছু সম্পূরক বার্তাও দিয়েছেন। পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ যখন ভালো থাকে তখন একটা শ্রেণি ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। ইস্যু তৈরি করে। এদেশের মানুষ ভালো থাকুক সুখে-শান্তিতে থাকুক তা একটা শ্রেণি চায় না। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতাও আসে তার বক্তব্যে। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে তার চেষ্টায় অটল থাকার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।
গত কিছুদিন সকাল-সন্ধ্যায় লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ে পেঁয়াজের। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সমাজের সামর্থ্যবান অনেকেও বাধ্য হয়ে কম টাকায় পেঁয়াজ কিনতে টিসিবির ট্রাকের কাছে ভিড় করেন। এ অবস্থায় খোদ প্রধানমন্ত্রীই জানিয়েছেন, তিনি নিজেই পেঁয়াজ খাচ্ছেন না। এরপর এ নিয়ে তেমন কথা খাটে না। কিন্তু বাজার তো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই নিয়ন্ত্রণ তাহলে কে কাকে করবে? আজ কার বা কাদের কারসাজিতে প্রধানমন্ত্রীকেও পেঁয়াজ ছাড়াই তরকারি খেতে হচ্ছে? কে বা কারা এসবের নিয়ন্ত্রক? সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় পেঁয়াজের আড়তে চালানো অভিযানে চড়াও হওয়া সাহসীজনরাই বা কারা? কাদের কারসাজির জেরে চট্টগ্রামে বস্তায়-বস্তায় পচা পেঁয়াজ ফেলা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে? এতদিন কাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল পেঁয়াজগুলো? এ ধরনের বহু প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
ভারত রফতানি বন্ধ করায় ২৯ সেপ্টেম্বর থেকেই মূলত দেশে নতুন করে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। দফায় দফায় বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার খবরের সাথে সাথে প্রথমবারের মতো ১০০ টাকায় পৌঁছে দেশি পেঁয়াজের কেজি। খুচরা পর্যায়ে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ ১০০-১১০ টাকা কেজি বিক্রি হতে থাকে। এরপর কিছুদিন পেঁয়াজের দাম অনেকটা স্থির ছিল। ৭০-৮০ টাকা কেজিতে নেমে আসে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পর আবারও পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং আমদানি করা পেঁয়াজ আসছে না এমন অজুহাতে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে আবারও ১০০ টাকার ওপরে পৌঁছে যায় পেঁয়াজের কেজি। এরপর বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকার নিচে নামানো সম্ভব নয়। তার বক্তব্যে বাজার পরিস্থিতিতে আগুনের মধ্যে ঘি পড়ার অবস্থা হয়। ১০০ টাকা থেকে সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের কেজি উঠে যায় ১৩০ টাকায়। এ পরিস্থিতিতে শিল্পমন্ত্রী জাতীয় সংসদে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক আছে দাবি করার পরের দিনই পেঁয়াজের কেজি ১৫০ টাকা পৌঁছে যায়। শুধু এখানেই থেমে থাকেনি পেঁয়াজের দাম বাড়ার খরস্রোত। এক লাফে ১৭০-১৮০ হয়ে পৌঁছে যায় ২০০ টাকায়। সপ্তাহের শেষদিন তা আরও বেড়ে ২৫০ টাকায় পরদিন কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে হয়ে যায় ২৮০ টাকা পর্যন্ত। ডাবল সেঞ্চুরি ছাড়িয়ে পেঁয়াজের দাম ট্রিপল সেঞ্চুরি হাঁকানোটাই এখন শুধু বাকি। অথচ দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই এবং আড়ত, গুদাম, দোকান, সরবরাহ কোনো কিছুতেই কমতিও নেই।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কপাল খুলেছে আড়তদার-মজুদদার, পাইকার-খুচরা সবারই। প্রতি কেজি পেঁয়াজে একশ টাকাই লাভ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের।

জানা যায়, চলতি সপ্তাহে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের আড়ত পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে একটি আড়তে অভিযানে পেঁয়াজের ক্রয় রসিদে মূল্য ১৩৭ টাকা লেখা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ওই পেঁয়াজ বিক্রি করছে ২২০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারিতে কেজিতে লাভ করছে ৮৩ টাকা। এ অভিযানে কিছু আড়তকে অবশ্য বিভিন্ন অঙ্কে জরিমানাও করে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এটাই সমাধান নয়।
এবার পেঁয়াজ বাজারের হালচালে অনেক কিছুই রহস্যঘেরা। আড়ত-গুদামেও ঘাটতি নেই। খুচরা-পাইকারি সব বাজারেই পেঁয়াজের স্ত‚প। তারপরও দাম কমবে বলে শুধু আশ্বাস পাচ্ছি আমরা। কিন্তু দিন দিন দাম শুধু বাড়ছেই বাড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না পেঁয়াজের বাজারে আজ অদৃশ্য কালো থাবা পড়েছে। তাদের সেই অদৃশ্য থাবা থেকে ধান-কুড়া, চাল-চালতা, চামড়া-আমড়া এমনকি কয়লাও বাদ যায় না। ক্যাসিনোসহ চাঁদাবাজ, বখরাবাজ দমনের মাঝপথে এখন তারা ভর করেছে পেঁয়াজবাজারে।

জানা কথা পেঁয়াজের জন্য বাংলাদেশ বরাবরই প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল। এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভারতেও পেঁয়াজের ফলন কম হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাহিদার তুলনায় কমেছে সরবরাহ। আর এই অবস্থার সদ্ব্যবহারে একটুও দেরি করেনি বাংলাদেশের সিন্ডিকেটবাজরা। ফলে বাংলাদেশে পেঁয়াজের কেজি ডবল সেঞ্চুরি পার করে নিয়ে গেছে তারা। ছড়িয়েছে নাই-নাই হাহাকার। গোটা ব্যাপারটাই পাকা হাতের কারসাজি। সচরাচর শুধু ঈদ মৌসুমেই পেঁয়াজের ঝাঁজে তেতে ওঠে একটি চক্র। সরকারের আগাম পদক্ষেপের কারণে গেল দুই ঈদের কোনোটাতেই সুবিধা করতে পারে নাই ওরা। তখন দম ধরেছে। হাল ছাড়েনি। সুযোগের অপেক্ষা করেছে। তাই এখন কোনো উৎসব বা মৌসুম ছাড়াই নেমেছে কোমর বেঁধে। গত কদিনে জনগণের পকেট কেটে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। নিচ্ছেই, দমছে না কিছুতেই।

এর আগে কখনও দেশের বাজারে এত বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়নি। পেঁয়াজের এ হুড়োহুড়ির ফাঁকে দেশে চড়ে গেছে চালের বাজার। চিকন ও মোটা সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫-৭ টাকা বেড়েছে। পেঁয়াজের ঝাঁজে চাল নিয়ে চালবাজিও জমে উঠেছে। বিক্রেতাদের দাবি, তাদের করার কিছু নেই। মোকাম বা পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে বলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। চালকল মালিক ও ধান-চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন বাজারে চিকন ধানের সংকট থাকায় বেশি দামে ধান কিনতে হচ্ছে। যার ফলে চালের দাম বেড়ে গেছে। আবার সাধারণ মানুষেরও বলার কিছু নেই। করারও নেই। পেঁয়াজের মতো তো আর চাল খাওয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়।
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা বিকল্প আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পেঁয়াজের জন্য বাংলাদেশকে ভারতসহ বিদেশের ওপর নির্ভর করতেই হবে। এটাই সারকথা। নানা বিতর্ক-গড়মিলের পরও পশুসম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সম্প্রতি দেওয়া তথ্য আশা জাগিয়েছে। মাছ উৎপাদনে এখন দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাথপিছু ডিম গ্রহণের হারও আন্তর্জাতিক মানদন্ডের কাছাকাছি। এখন গো-সম্পদ বা মৎস্য নিয়ে বাংলাদেশে বিদেশ নির্ভরতা বা প্যানিক কমেছে উৎপাদনের সক্ষমতার সুবাদে। দেশে গত কয়েক বছরে পশুসম্পদের উৎপাদন গর্ব করার মতো। চার-পাঁচ বছর আগেও গরু-ছাগলের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাজারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর লালন-পালন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ফল মেলে দ্রুত। দেশ গরু-ছাগলে এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
একসময় ছিল শুধু কোরবানি ঈদের আগে দেশে ২০-২২ লাখ গরু-ছাগল বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে আসত। সারা বছরে এই সংখ্যা ৩০ লাখে ছুঁয়ে যেত। ভারত থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ হওয়ার পর দেশে এখন প্রতি বছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। ছোট-বড় মিলিয়ে এখন খামারের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। গত তিন বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। বাড়ছে ভেড়া-মহিষ উৎপাদনও। গরু-ছাগলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে এ খাতে এসেছে বাংলাদেশের বৈশ্মিক অবস্থানের উন্নতি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনেও এর স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। তাই এখন পেঁয়াজ, রসুন, আদার মতো অন্যান্য মসলা নিয়েও ভাবতে হবে আমাদের। তবে, কারসাজি-চালবাজির লাগাম টানতে না পারলে উৎপাদন বাড়িয়েও সুফল অনিশ্চিত থাকতে পারে। যার প্রমাণ পেঁয়াজের ফাঁকে চাল নিয়ে চলমান চালবাজি।



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে