ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ! বিএনপির ভোটতলা, ন্যাড়ার বেলতলা

0
36


ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ! বিএনপির ভোটতলা, ন্যাড়ার বেলতলা

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তর ও দক্ষিণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, জালিয়াতি করে ফল নিয়ে যাবে সরকারি দল এমনটি বলার পরও নির্বাচনে রয়েছে বিএনপি। কেন এমন স্ববিরোধীতা দলটির ? নিশ্চিত পরাজয় জেনেও নির্বাচনে যাওয়া ? এর একটি ব্যাখ্যা অবশ্য দিয়ে আসছেন বিএনপি নেতারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছেন, গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ব্যাপারটা কি আসলে এমনই ?
তার এত সরলী বক্তব্যের সার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যুক্তিও বেশ খোঁড়া। সিটি নির্বাচন একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ নির্বাচনে শরিক হওয়া বা জয়-পরাজয়ের সঙ্গে গণতন্ত্র বা কোনো নেতানেত্রীর মুক্তির কী সম্পর্ক ? তা কি প্রভাব ফেলবে বিএনপির রাজনীতিতে ? সাংগঠনিক শক্তিতে ? বা আন্দোলনে ? কোনো সিটি বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের মন জোগাতে সচরাচর প্রার্থীরা তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানান। ঢাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা সেটাই করছেন। আতিক কিংবা তাপস ফুরফুরে মেজাজে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। তা করতে গিয়েও তামাশায়ও কমতি করছেন না। এ ছাড়া, ক্ষমতার সুবাদে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড তাদের জন্য বেশ মসৃণ। জয়ের আগেই বিজয়ীর ভাব। ভাব এবং ভঙ্গিতে তারাও সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
বিএনপির জন্য সেটা নেই। পথ তাদের কণ্টকাকীর্ণ। অনেকটা বন্দি বা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে চলছে তাদের গণসংযোগ। কিন্তু, বিএনপি প্রার্থীদের কণ্ঠে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা একেবারে সামান্য। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ও নেত্রীর মুক্তি দাবি করে কিছু কথামালার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন তারা। নগরবাসীর কাছে এসব কথা কতদূর আবেদন রাখতে পারবেন গুরুতর প্রশ্ন। পাশাপাশি এ কথাও অস্বীকারের জো নেই নির্বাচন বলতে যেটা বুঝায় সেটা বাংলাদেশে সংশয়ে আছে অনেক আগেই। নির্বাচনি ব্যবস্থাকে বিদায় কে করেছে, এর পেছনে কে কতটা দায়ী সেটা ঐতিহাসিক অংশ হয়ে গেছে। নতুন করে সেই আলোচনার দরকার নেই।

আবার সিটি করপোরেশনের মতো নির্বাচনে জেতার ব্যাপারে বিএনপির সামর্থ্য দলের জন্য সুফল দেয়নি। এলাকায় উন্নয়ন হয়নি সেটাও প্রমাণিত। গাজীপুর, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, খুলনায় এর আগে জেতার পর বিএনপির মেয়ররা উল্টো নাজেহালের শিকার হয়েছেন। সিটি করপোরেশন চালাতে পারেননি। চেয়ারেও বসতে পারেননি ঠিক মতো। মামলার পর মামলায় দফায় দফায় জেল খেটেছেন। এমন জেল খাটার চেয়ে ফেল করা ভালো ছিল বলে অনেকের রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য। এমন দুর্গতির বিনিময়ে দলের জন্যও তারা কিছু করতে পারেননি। পারেননি নিজের কল্যাণে কিছু করতেও। দলের নেতাকর্মীদের কিছু দিতে পারেননি। ক্ষেত্রবিশেষে আরও বিপদে ফেলেছেন। এটাই বাস্তবতা। কথার কথা এবার ঢাকায় বিএনপির ইশরাক-তাবিথরা জিতলেও কী কিছু করতে পারবেন ? গণতন্ত্র বা তাদের নেত্রীর মুক্তির ব্যাপারে ভূমিকা রাখার ন্যূনতম সুযোগ তাদের থাকবে ? অথবা তাদেরও যে গাজীপুরের মান্নান, রাজশাহীর বুলবুল বা খুলনার মনির মতো দশা হবে না, সেটার কোনো নিশ্চয়তা আছে ? বরং সেটার শঙ্কাই বেশি।

অবশ্য সিলেট-কুমিল্লায় বিএনপিদলীয় মেয়ররা তৈরি করেছেন ভিন্ন ইতিহাস। ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহতায় টিকে আছেন তারা। এরপরও আজ্ঞায় ঘাটতি হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন সরকারদলীয় এমপি বা মন্ত্রীদের দরবারে। প্রধানমন্ত্রীর স্তুতি গেয়ে বিনোদন জোগান দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে বিশাল সাইজের বিজ্ঞাপনও দিতে দেখা যায়। বলতে গেলে সরকারি দলের সঙ্গে মিলমিশে-ভাগেযোগে শুধু চেয়ারটা ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা। দলের তেমন কোনো কাজে আসছেন না। বেশিরভাগ সময় কর্মীদেরও এড়িয়ে চলেন। গণতন্ত্র বা দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে ভূমিকা রাখা দূরে থাক, এ নিয়ে কোথাও দু’চারটা কথা বলেছেন সেটাও দেখা যায় না।

গেল নির্বাচনে গোহারার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তারা সংসদে যাবেন না। পরে গেছেন। তবে, তিনি নিজে ছাড়া। বগুড়ার পাস করা আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এতে কী লাভ, কী ক্ষতি সেটা তারাই ভালো বোঝেন। তাদের নিশ্চয়ই কোনো হিসাব আছে। সংসদে গেলে নির্বাচনের ফলাফলকে বৈধতা দেওয়া হয়, এটি তারা জানেন। সংসদে না গেলে তারা বাইরে থেকে ‘অবৈধ সংসদের’ নিন্দা-সমালোচনা চালিয়ে যেতে পারবেন সেটাও তারা জানেন।

বাংলায় প্রবাদ আছে ন্যাড়ায় বারবার বেলতলায় যায় না। বেলতলায় গেলে কী হয়  ন্যাড়া সেটা একবারেই বুঝে ফেলে। ন্যাড়া বলতে আমরা বুঝি ভোলাভালা ধরনের নিরীহ কোনো ব্যক্তি। যেখানে দেশের মানুষও ন্যাড়া হয়ে এখন ভোটবিমুখ। ২০০৯ সালের জানুয়ারির পর জাতীয় বা আঞ্চলিক সবগুলো নির্বাচনেই প্রার্থী কম, ভোটার কম, ভোটও কম। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসল-নকল মিলিয়ে ভোট পড়েছিল ৪০ শতাংশ। এর বেশি দেখাতে পারেনি তখনকার নির্বাচন কমিশন। তাতে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৬ জনের বিনা চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে কোনো অসুবিধা হয়নি। সেবার ক্ষমতাসীন দলের ২৬৫ জন বিজয়ী বলে ঘোষিত হন। ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে আরও কম ভোটার হলেও এক দলের সর্বাধিক প্রার্থী ২৯২ জন জয়ী হন। এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার মধ্যেও কেন বারবার স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি ? এটি ছোট, কিন্তু মোটাদাগের প্রশ্ন। কিন্তু, বিএনপি বারবারই যাচ্ছে ভোটতলায়। কেন? তাদের বোধের অভাব ? না-কি বাড়তি কোনো বুঝ ?

বিএনপি মোটেই ন্যাড়া বা ভোলাভালা নয়। বিশাল দল। তাদের তো আরও বেশি বোঝার কথা। তাহলে গোলমাল বা ব্যতিক্রমটা কোথায় ? ২০১৪ সালে না গেলেও পরে কেন বারবার তাদের এই ভোটতলায় যাওয়া ? ভোটগাছের নিচে গিয়ে তারা কষ্ট পায়। নির্বাচন কমিশনের চাতুরি দেখে। এর প্রতিবাদে আন্দোলনের হুঙ্কার দেয়। নেতারা মামলা-হামলায় পড়েন। জেল খাটাসহ নানা আজাব ভোগেন নেতা, কর্মী, সমর্থক সবাই। এর বাইরে যাওয়ার উপায়ও যেন নেই দলটির। বলা হয়ে থাকে, বিএনপি গত নির্বাচনে গিয়েছিল দলের নিবন্ধন বাঁচাতে। পরপর দুবার নির্বাচন না করলে দলের নিবন্ধন থাকে না, সেই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বিএনপিকে বাদ দেওয়া সহজ ছিল কারণ আদালত নির্বাচন কমিশন সবই সরকারের অনুকূলে।

কারও কারও মতে, বর্তমানে বিএনপিও সরকারি ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে নয়। এ কারণে ‘যা হয়েছে তা ভালো হয়েছে, যা হচ্ছে তাও ভালো হচ্ছে এবং যা হবে তাও ভালোই হবে।  এমন একটা অপেক্ষায় সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার দেওয়া ছাড়া তাদের আর গতিও অবশিষ্ট নেই। আরেকটা গতি হচ্ছে বারবার ভোটতলায় গিয়ে নাজেহাল হয়ে নিজের নাক-কান সব কেটে সরকারের যাত্রা ভঙ্গ করতে।

এমন চরমভাবে বিপর্যস্ততা কাটাতে কোনো পথে এগোবে তা ঠিক করতে হবে বিএনপিকেই।
টানা এক যুগেরও বেশি ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি না নির্বাচনে, না মাঠে, না কৌশলে কোনোভাবেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে কুলাতে পারছে না। সেটার লক্ষণ নেই। বাস্তবতাও নেই। এতে ক্ষমতাবলয়ের কাছাকাছি থেকে অভ্যস্ত নেতাকর্মীদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙাই স্বাভাবিক। সাদা চোখে এ অবস্থায় বিএনপির সামনে দুটি পথ খোলা। হয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর হতাশায় আরও মুষড়ে গিয়ে শেষ হয়ে যাওয়া। নইলে দলকে গুছিয়ে জনবান্ধব কর্মসূচি দিয়ে আবার রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হওয়া; গোড়ালি শক্ত করে টিকে থাকা। সরকারি দল সব সময় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহারের সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচিতও হচ্ছে। বিএনপি সেই সুফল নিজেদের আমলনামায় নিতে পারছে না। ক্ষমতার সুযোগ বিএনপিও পেয়েছে। ব্যবহারও করেছে। কিন্তু টিকতে পারেনি। এ থেকেও শিক্ষা নেওয়া, নিজেদের শোধরানো এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার চিন্তা নিতে পারে।

 



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে