কিছু নারী নেত্রীর নিয়ন্ত্রণে চলছে দেশের অপরাধ জগত

0
54


কিছু নারী নেত্রীর  নিয়ন্ত্রণে চলছে দেশের অপরাধ জগত

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক সংগঠনের এক শ্রেণির নারী নেত্রী। অনেকেই পরিচ্ছন্ন-শুদ্ধ রাজনীতি করলেও বেশিরভাগই বিভিন্ন পদ পেয়েই হয়ে উঠছে বেপরোয়া। তাদের মধ্যে আবার চেহারা সুন্দর হলে তো কথাই নেই। একদিকে ক্ষমতার দাপট এবং আরেকদিকে নারী হওয়ায় বিশেষ সুযোগ পেয়ে তারা নির্বিঘ্নে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে গত শনিবার দেশি-বিদেশি বিপুল মুদ্রা, অস্ত্র ও মাদকসহ নরসিংদী জেলা যুব মহিলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নুর পাপিয়া র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হলে  এ নিয়ে আরও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

শামিমা নুর পাপিয়া গ্রেফতার নিয়ে নরসিংদী জেলাসহ সারা দেশেই এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও পাপিয়ার নানা কুকীর্তির তথ্য ও ছবি প্রকাশ করছেন অনেকে। এ অবস্থায় রবিবার পাপিয়াকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তবে কেবল পাপিয়াতেই শেষ নয়, এমন আরও বেশ কয়েকজন নারী নেত্রীকে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারিতে রেখেছে বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় এক শ্রেণির সুন্দরী নারীরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হয়ে নেত্রী বা কর্মীর পরিচয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে নানা অপকর্মে। এ ক্ষেত্রে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগ বেশি। রাজধানী ঢাকায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজ নিজ এলাকায় তারা ব্যাপক প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে এখন তারা প্রতিষ্ঠিত। ঢাকায় কিংবা বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন দলের বা অঙ্গসংগঠনের রাজনীতি করলেও তাদের বেশিরভাগের টার্গেট রাজধানীকেন্দ্রিক। তাদের এ অপকর্মের মধ্যে রয়েছে, সচিবালয়কেন্দ্রিক তদবির বাণিজ্য, চাকরি ও টেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি ও দফতরগুলোতে তদবির, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা অপকর্মে তারা জড়িয়ে গেছে বলে জানা যায়।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া যুব মহিলী লীগের নেত্রী পাপিয়ার অপরাধ জগৎ নতুন করে সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের এ নেত্রী অভিজাত পাঁচ তারকা হোটেলে সুন্দরী নারী সহযোগীদের নিয়ে দেহ ব্যবসার পাশাপাশি মদের আসর বসিয়ে বিপুল টাকা কামাচ্ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ড তিনি পরিচালনা করতেন বলিউডে ভয়ঙ্কর নারী ভিলেনদের মতো করে। হাতে মোটা বেতের লাঠি, ভিন্নধর্মী পোশাকে সোফায় আয়েশি বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার এমন একাধিক ছবিও প্রকাশ হয়েছে পাপিয়ার। পাপিয়ার মতো এমন আরও অনেকেই এসব অপকর্মে জড়িত রয়েছে বলেও জানা গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার-বিন-কাশেম নিউজ টাঙ্গাইলকে বলেন, গ্রেফতারকৃত পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর নরসিংদী এলাকায় ‘কিউঅ্যান্ডসি’ নামক একটি ক্যাডার বাহিনী আছে। যাদের মাধ্যমে তারা নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির, মাসোহারা আদায়, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য সকল প্রকার অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের এ ক্যাডার বাহিনীর অনেকের নাম ইতোমধ্যে জানা গেছে, যাদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে।

তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা বা বৈধ তেমন কোনো আয়ের উৎস নেই পাপিয়ার। তবুও স্বল্প সময়েই বিপুল সম্পত্তি ও অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া। রাজধানীর ফার্মগেটের ২৮ ইন্দিরা রোডে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গাড়ি, নরসিংদী শহরে দুটি ফ্ল্যাট এবং বাগদী এলাকায় দুই কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লটও রয়েছে তার। অবৈধপন্থায় এসব বিত্ত-বৈভবের মালিক হন পাপিয়া। এ কাজে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন গ্রেফতারকৃত জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন। পাপিয়ার এসব অপকর্মের নেপথ্যে বা তার সঙ্গে আর কে বা কারা আছে তদন্ত করে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বলছেন, নরসিংদীতে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আর্থিক প্রতারণা, জমির দালালিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এ জন্য তিনি ক্যাডার বাহিনীও পুষতেন। এ ক্যাডার দিয়ে টার্গেট করে বিভিন্ন তরুণীকে জিম্মি করে দেহ ব্যবসায় তিনি বাধ্য করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রমাণ যখন র‌্যাবের হাতে পৌঁছে যায় তখন উপায় না দেখে দেশ থেকে পালাতে চেষ্টা করেন পাপিয়া ও তার স্বামী। কিন্তু শনিবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেফতার হন তারা।

র‌্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখা জানিয়েছে, র‌্যাবের অভিযানে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গোপনে দেশত্যাগের প্রাক্কালে শনিবার পাপিয়া, তার স্বামী সুমন চৌধুরী এবং তাদের সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে গ্রেফতার করা হয়। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নারী সংক্রান্ত অনৈতিক কর্মকাণ্ড, জালনোট সরবরাহ, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে পাপিয়ার দেওয়া তথ্যমতে, রবিবার ভোরে হোটেল ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিংকৃত বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট রুম থেকে এবং ফার্মগেট এলাকার ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডস্থ ‘রওশন’স ডমিনো রিলিভো’ নামক বিলাসবহুল ভবনে তাদের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুইটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৫ বোতল দামি বিদেশি মদ ও ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ভিসা-এটিএম কার্ড ১০টি উদ্ধার করা হয়। ওইসব সম্পদের বাইরেও পাপিয়া-সুমনের তেজগাঁও এফডিসি গেট সংলগ্ন এলাকায় অংশীদারিত্বে তাদের ‘কার একচেঞ্জ’ নামক গাড়ির শোরুমে প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। নরসিংদী জেলায় ‘কেএমসি কার ওয়াস অ্যান্ড অটো সলিউশন’ নামক প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ আছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের নামে-বেনামে অনেক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত আছে বলেও র‌্যাব জানতে পেরেছে।

পাপিয়াকে বহিষ্কার : দেশি-বিদেশি মুদ্রা এবং নগদ টাকাসহ র‌্যাবের হাতে আটক নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নুর পাপিয়াকে বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রবিবার যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়াকে গঠন তন্ত্রের ২২ (ক) উপধারা অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলো। এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।

সবার মুখে পাপিয়ার কুকীর্তি :  নরসিংদীতে পাপিয়া মতির দম্পতির কথা এখন টপ অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। যুবনেত্রী পাপিয়ার ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমনকে নিয়ে নরসিংদী জুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। রাজনীতির অন্তরালে অস্ত্র, মাদক ও দেহ ব্যবসায় জড়িত থাকার দায়ে র‌্যাব তাদের আটক করে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল বাইজি সর্দারনিবেশে পাপিয়ার ভিডিও। নারী নেত্রীর অন্তরালে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বের হতে শুরু হয়েছে নানা বিচার বিশ্লেষন। মুখ খুলতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। দূরদর্শী চতুর ও মাস্টারমাইন্ড সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিভাজকে কেন্দ্র করে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন সদর আসনের এমপি লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলামের (বীরপ্রতীক) বলয়ে যোগ দেন। পাশাপাশি তাদের ঢাকা সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পরই ভয়ঙ্কর ছক কষে অপরাধের স্বর্গরাজ্য তৈরি করেন পাপিয়া-সুমন।



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে