ছোট্ট একটি আমলে যেসব নেয়ামতের বর্ণনা দিলেন বিশ্বনবি

0
67
ছোট্ট একটি আমল। যার অসংখ্য নেয়ামত তুলে ধরলেন বিশ্বনবি। এ আমলটি হলো ধৈর্যধারণ করা। এ ছোট্ট আমলটি শুধু মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং মহান আল্লাহ তাআলার অন্যতম গুণ।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার এ গুণে নিজেদের রঙিন করার ঘোষণা দিয়েছেন। হাদিসে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধৈর্যধারণকারীদের জন্য সুনিশ্চিত অসংখ্য নেয়ামত লাভের ঘোষণা দিয়েছেন।

যারা আল্লাহর অনুসরণ ও অনুকরণে সব কাজে নিজেদের ধৈর্যশীল হিসেবে প্রস্তুত করবেন আল্লাহ তাদের শুধু সাহায্যই করবেন। দুনিয়া ও পরকালে শুধু নেয়ামতই দান করবেন না বরং তাদের সঙ্গে থাকবেন। এমন ঘোষণাই দিয়েছেন তিনি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে ধৈর্য এবং নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৫৫)

ধৈর্যশীলদের মর্যাদা যে কারণে বেশি
সৃষ্টি জগতে সবচেয়ে বেশি ধৈর্যধারণ করেন মহান আল্লাহ তাআলা। প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির জন্য রয়েছে এখানে মহান শিক্ষা। তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। কারণ-
আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি জগতের সব অবাধ্য সৃষ্টি জীবের অবাধ্যতা ও বিরোধিতায় ধৈর্যধারণ করেন। এ সৃষ্টি জগতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের কোনো তোয়াক্কা না করে যারা তার স্বেচ্ছাচারিতা তথা তার নিয়মের বাইরে নিজেদের পরিচালিত করেন। তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ ধৈর্যশীল।

তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি সর্ব শক্তিমান। তিনি ইচ্ছা করলেই মুহূর্তের মধ্যে সব অবাধ্যকারীকেই ধ্বংস করে দিতে পারেন। কিন্তু না, তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি চরম অবাধ্যতায় সৃষ্টি জগতের কাউকে ধ্বংস করেন না। বরং পরম ধৈর্যের সঙ্গে অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য বান্দার সব অন্যায় ও অনিয়ম সহ্য করেন।

চরম অবাধ্যতায় আল্লাহ তাআলা অকৃতজ্ঞ বান্দাদেরও তিনি আলোবাতাস ও রিজিক দিয়ে সুস্থ, সবল ও সুন্দরভাবেই বাঁচিয়ে রাখেন।

বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা ও নেয়ামতের ঘোষণা
মহান আল্লাহ তাআলার এ ধৈর্য থেকে অনুগত মুমিন বান্দারা তারই ধৈর্যের গুণে নিজেদের রঙিন করবেন। ধৈর্যের মহান শিক্ষাগ্রহণ করবেন।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে চরম বিপদ ও হতাশা দিয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন। সব ধরনের বিপদ ও হতাশায় অধৈর্য না হয়ে, ভেঙে না পড়ে ঈমানের দৃঢ়তায় এ পরীক্ষায় পাস করতে হবে। যেভাবে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি জগতের সব সৃষ্টির অবাধ্যতায় নিজে ধৈর্যধারণ করেন, ঠিক সেভাবেই ঈমানদার বান্দাও সব বাধা ও বিপদের মধ্যে ধৈর্যধারণ করবেন।

চরম বিপদ ও হতাশায় যখনই মানুষ ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তখনই সে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার প্রতিযোগিতায় অর্ধেক ঈমান পরিপূর্ণ করবেন।

কেননা হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, ‘সবর বা ধৈর্যধারণ ঈমানের অঙ্গবিশেষ।’ তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’

ধৈর্যধারণ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসংখ্য নেয়ামতের ঘোষণা দিয়েছেন। যাতে মানুষ ধৈর্যধারণে উদ্বুদ্ধ হয়। অধৈর্য না হয়। আর তাহলো-
>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ তাআলা তার ধৈর্যগুণ আরও বাড়িয়ে দেন।’

>> ধৈর্য মানুষের জন্য অনেক বড় নেয়ামত। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষ-নারীদের দৈহিক, আর্থিক ও পারিবারিক বিপদ-আপদ মৃত্যু পর্যন্ত আসতেই থাকে। যারা এতে ধৈর্যধারণ করে, এ দ্বারা তাদের গুনাহ ক্ষমা হয়।’

>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘যে মুসলমান মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে এবং তাদের অত্যাচার-উৎপীড়ন ধৈর্যের সঙ্গে বরণ করে নেয়; নির্জনবাসী সুফিসাধক ব্যক্তি থেকে তারা বহুগুণে উত্তম।’

>> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা কোনো লোককে যে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, তা কোনো ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা অর্জিত হয়। বরং শুধু ধৈর্যজনিত কারণেই আল্লাহ তাআলা তা দান করেছেন।’

>> ধৈর্যধারণ মুমিনের জন্য কত বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিজের জান-মালের ক্ষতি গোপন করে ধৈর্যধারণ করবে, আল্লাহর জন্য সে ব্যক্তিকে ক্ষমা করা ওয়াজিব হয়ে যায়। হাদিসের ঘোষণা-
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন, যার জানমালের প্রতি বিপদ এসেছে, কিন্তু সে তা গোপন রেখেছে; (হাহুতাশ ও হৈচৈ করে) লোকের কাছে তা প্রকাশ করেনি, তাকে ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়।

>> আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকেই বেশি বেশি বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। আবার যারা এ বিপদে ধৈর্যের পরীক্ষায় পাস করেন তাদের ব্যাপারে হাদিসে ঘোষণা-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, মানুষের সাওয়াবের প্রাচুর্য বিপদের প্রাচুর্যের প্রতি নির্ভরশীল। আল্লাহ যে সম্প্রদায়কে অধিক ভালোবাসেন, তাদের প্রতি অধিক বিপদ দিয়ে থাকেন। যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্যধারণ করে, কেয়ামতের দিন ওই বান্দার সন্তুষ্টিলাভ সুনিশ্চিত। আর যে ব্যক্তি বিপদে অধৈর্য হয়ে পড়ে, কেয়ামতের পেরেশানিও তার জন্য সুনিশ্চিত।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত বিপদ যত কঠিনই হোক না কেন, ধৈর্যধারণই তার সর্বোত্তম কাজ ও গুণ। যে গুণে নিজেকে রাঙাতে পারলেই যেমনি সফল হবে দুনিয়ার জীবন তেমনি পরকালের জীবনেও সে হবে সফল।

পরিশেষে…
ধৈর্যধারণকারীদের জন্য হাদিসে বর্ণিত মহান আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ নেয়ামতের ঘোষণায় উল্লেখ করা জরুরি। আর তাহলো-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন দাতা ও শহীদদের সব হিসাব গ্রহণ করা হবে; কিন্তু বিপদ-আপদের (ধৈর্যের) হিসাব গ্রহণ করা হবে না। তাদের আমল ওজনের জন্য দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে না। তাদের প্রতি শুধু সাওয়াবের ধারা বর্ষিত হতে থাকবে। তখন (এসব নেয়ামত দেখে) দুনিয়ার যারা কোনো রূপ বিপদগ্রস্ত হয়নি, শুধু নিরবচ্ছিন্ন সুখ-শান্তি ভোগ করেছে, তারা আফসোস করে বলতে থাকবে, হায়! দুনিয়াতে যদি আমরাও দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতাম! এমনকি যদি কাঁচি দিয়ে আমাদের গায়ের চামড়া খসিয়ে ফেলা হতো! (আজ আমরা সুখী হতাম, আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করতাম)।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দুনিয়ার সবক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ ধৈর্যধারণ করার তাওফিক দান করুন। ধৈর্যের রঙে নিজেদের রাঙানোর তাওফিক দান করুন। হাদিসে ঘোষিত ধৈর্যধারণের সব নেয়ামত লাভ করার তাওফিক দান করুন। সর্বোপরি ধৈর্যধারণ করার মাধ্যমে আল্লাহকে সব সময় নিজেদের সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে