দেশে শিক্ষা ও নীতি নৈতিকতার সংকট ক্রমশ বাড়ছে

0
147


দেশে শিক্ষা ও নীতি নৈতিকতার সংকট ক্রমশ বাড়ছে

আমাদের দেশে এখন শিক্ষা ও নীতি নৈতিকতার সংকট ক্রমশ বাড়ছে। যা আমাদের বর্তমান তো বটেই আগামী প্রজন্মকেও একসময় রীতিমতো এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
দৃশ্যত, আমাদের দেশে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অভাব নেই। এবং দিনে দিনে তা আরও বাড়ছে। কিন্তু যেভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়ে চলেছে, মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ পাচ্ছি ক’জন ? এখানেই উঠছে মানের প্রশ্ন, সুশিক্ষার প্রশ্ন।

আমাদের দেশে এখন লাখ লাখ প্রাইমারি আর মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেমন গড়ে উঠেছে তেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন নামে। কিন্তু কেউ কি একটু লক্ষ করে দেখেছেন যে, এসব ছোট-বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবকাঠামোগতভাবে সঠিক, শিক্ষাদানের মানের প্রশ্নতো পরের বিষয়। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তো সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগও উঠেছে বহু আগে থেকে। সবচেয়ে অবাক বিষয় হচ্ছে, সেসব তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু এখনও চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি কার কাছে আছে এর প্রতিকার ? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া শর্তাবলির কিছু কিছু শর্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনই মানেনি, মানানো যায়নি তাদের দিয়ে। সেখানে চলেছে ক্ষমতার দাপট। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সমস্যার অন্ত নেই। অথচ সেসব সমস্যা দূর করে একেকটিকে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সে উদ্যোগ নেওয়া দরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার অভাব রয়েছে। মাঝেমাঝেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারা পথে নেমে আসেন, শিক্ষা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা দূর করতে বা শিক্ষার মনোন্নয়নের কোনো প্রস্তাব নিয়ে নয় বরং নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে। এজন্য তারা মানববন্ধন থেকে শুরু করে অনশন কর্মসূচিও পালন করে। আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বা উদ্যোক্তাদের দৌড়ঝাঁপ আর তদবির দেখেছি তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে এমপিওভুক্ত করার জন্য। বেসরকারি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষাদান কার্যক্রম যাই থাক না কেন নানাভাবে অর্থ আদায়ের কৌশলের কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না।

টাকার খেলাটা যে কীভাবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ীরূপ পেয়েছে সেটা অভিভাবকরা হাড়ে হাড়ে টের পান ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করার সময়ে, বিশেষ করে রাজধানীতে। স্কুল-কলেজের কত রকম উন্নয়নের জন্য যে টাকা দিতে হয় বছরের বিভিন্ন সময়ে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এর সঙ্গে আছে নানা অনুষ্ঠানাদির জন্য চাঁদা। সরকারি তরফ থেকে এসব ব্যাপারে টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলেও নানা অজুহাতে সে নিয়ম ভেঙে ফেলা হয়। অভিভাবকদের তখন আর কিছু করার থাকে না। আর কোনো ব্যাপারে কোনো অভিযোগ জানিয়েও কোনো লাভ হয় না। বরং তাতে সন্তানের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অভিভাবকরা তখন বাধ্য হয়েই চুপ করে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সব সরকারের লক্ষ্য থাকে মানসম্পন্ন শিক্ষাদান যাতে ছাত্রছাত্রীরা তা গ্রহণ করতে পারে সেদিকে। কিন্তু সরকার চাইলেই সবাই যে সেদিকে লক্ষ রাখবে সেটা ভাবা যায় না। কেননা সেখানে তাদের নানাবিধ লক্ষ্য পূরণ নাও হতে পারে। ফলে হচ্ছে কী, শিক্ষাঙ্গনের উন্নতি যেমন হয় না, শিক্ষার্থীরাও না। এভাবে চলতে চলতে এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাজ্যের একটি জরিপের তালিকায় এক হাজারের মধ্যে বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি এত যে বিশ্ববিদ্যালয় তার একটিরও নাম নেই। তবে এরপরও বলতে বাধা নেই আমাদের শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার কমতি নেই। আমাদের ছেলেমেয়েরা সে চেষ্টা করলে পারে না, এমন নয়। এখনও পত্রিকার পাতায় কখনও কখনও এমন তরুণ শিক্ষার্থীদের কথা প্রকাশিত হয়, যারা এখান থেকে এসএসসি বা এইচএসসি পাস করে বিদেশে গিয়ে নিজ মেধা বলে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে বিভিন্ন বিষয়ে। নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে কর্মক্ষেত্রে গিয়েও। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে।তাদের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে বলি। এ লেভেল বা ও লেভেল পাস করে যারা যায়, তারাও তাদের পরিশ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রাখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কিন্তু শতকরা পাঁচ বা দশজন নিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না, এই হারটা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন আগামী প্রজন্মের জন্য। আমাদের তৈরি করতে হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মানুষ যাদের বুদ্ধি পরামর্শ আমাদের সবক্ষেত্রে উন্নয়নের আলোকবর্তিকা জ্বেলে দেবে। তাহলেই ধীরে ধীরে আমাদের সদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

অভিভাবকরা বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও আনেকটা পরীক্ষানির্ভর। আর সেই পরীক্ষার চাপে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা অস্থির হয়ে ওঠে। বাচ্চাদেরও এই চাপ থেকে মুক্তি মেলে না। সকাল থেকে রাত অবধি রুটিনমাফিক পড়াশোনা চালাতে গিয়ে কোমলমতি শিশুরা পর্যন্ত হাঁপিয়ে ওঠে। নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা ভালোলাগা, মন্দলাগার দিকে তাকাতেই পারে না। পরীক্ষা ও ক্লাসের পড়ার চাপ সামলাতে তারা নানা কোচিং সেন্টারের আশ্রয় নেয়। এই প্রবণতাই তাদের আমলে পিছিয়ে দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীরা মনের আনন্দে পড়াশোনা করে। যাদের মেধা বেশি তারা যেভাবে পড়াশোনা করে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী বিষয় বেছে নিয়ে। সে বিষয় নিয়েই তারা উচ্চতর ডিগ্রি নেয়। অন্যদিকে সাধারণ  মেধার ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের পছন্দমতো ট্রেড কোর্সগুলো শেষ করে নির্ধারিত কাজে যোগ দেয়। তাদের কোনো অভিযোগ থাকে না। আমাদের এখানে বিএ, এমএ পাস না করলেতো লেখাপড়াই হলো না। যারা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, এমবিএ বা তেমনি কোনো নির্দিষ্ট পেশার দিকে তাকিয়ে লেখাপড়া শেষ করে তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয় তাদের জন্য কোনো চাকরির দরজা সহজে খোলে না। তাদের জন্য বড় সুযোগ থাকে শুধু বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে। আর হয়তো সে জন্যই লাখ লাখ ছেলেমেয়ে এখন বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় প্রতিবছর। কিন্তু সেখানে কতজন সুযোগ পায়? যারা পায় তাদের না হয় কপাল খুলল, বাকিরা কোথায় যাবে? এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বয়স বাড়ানোর দাবিটি উঠেছে বারবার। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব ত্রুটি রয়েছে বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদদের দিয়ে সেই ত্রুটিগুলো দূর করে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা দরকার যাতে তরুণ-তরুণীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে তাদের বিষয়ভিত্তিক কর্মক্ষেত্রগুলোতে চাকরি পায়। আমাদের সবারই একটা কথা ভালো করে বোঝা উচিত যে, আমাদের একেকটি সন্তান সব বিষয়ে পারদর্শী বা প্রতিভাধর হতে পারে না। সর্বতোমুখী প্রতিভাধর মানুষরা হন ক্ষণজন্মা। সাধারণ মানুষরা তাদের প্রতিভাও মেধার নাগালে পায় না। নানাদিক বিবেচনায় নিয়ে এখনও বলা যায়, আমাদের যে বর্তমান সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈষম্যপূর্ণ আর্থিক অবস্থান তাতে কোনো শিশু বা তরুণ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। আশপাশের পরিবেশও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৈরী হয়ে দেখা দেয়। ফলে সে নিজেকে সঙ্কুচিত করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। এর মধ্যে অনেকে আবার ক্ষমতাশালীদের দলে ভিড়ে যায় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাবার জন্য। তা যদি অনৈতিক পথে হয় তাতেও তাদের আপত্তি থাকে না। পরবর্তীকালে এরাই অর্থ আর ক্ষমতার জোরে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে একসময় নেতা বনে যায়। তখন তাদের কাছে কোনো কিছুই অসাধ্য নয় বরং সহজলভ্য হয়ে যায়। সমাজে এদের দাপট এখন এত বেশি যে, ভালো মানুষের অস্তিত্ব টেকানোই দায় হয়ে উঠেছে। তবে ক্ষমতা আর বিশাল অর্থবিত্তও একদিন হঠাৎ করে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে তার প্রমাণ তো দেখলাম ক্যাসিনো কিংদের পতনে। বলতে বাধা নেই, এসব উদাহরণ আমাদের কখনও ভালো বার্তা দেয় না। সুপথে চলার পথও দেখায় না। মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও করপোরেট সংস্কৃতির কবলে পড়ে আমাদের দেশেও অস্থির হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের স্বাভাবিক চলার পথ। এই অস্থিরতা আমাদের জীবনের সবক্ষেত্রেই ছায়া ফেলেছে এবং সে ছায়া ক্রমে গাঢ় হয়েছে নব্য মাফিয়া চক্রের দুর্বৃত্তায়নে। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে বেরোনো খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না।



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে