থাক না পল্লীবন্ধু নামটা…….

0
129

রেজাউল করিম: ১৪ জুলাই। জাতি হারালো আরেকজন বিশেষ ব্যক্তিকে। আজ সকাল পৌনে আটটার দিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৯০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তিনি ছিলেন একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান অন্যদিকে ছিলেন একজন সেনাপ্রধান এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় পার্টী আর সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতি দিনটি স্মরণ রাখবে এমন প্রত্যাশা সবার। তবে এরশাদ কেমন থাকবে জাতির কাছে ? স্বৈরশাসক নাকি পল্লীবন্ধু?

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে হটিয়ে সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৩ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচ ছাত্র নিহত ও শতাধিক আহত হন। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম বলি হলেন জয়নাল, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, জাফর ও দীপালি সাহা। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো অংশ না নেয়ায় তার পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা আর সম্ভব ছিল না। এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়েন ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর।

আমরা সহজেই স্বৈরশাসক হিসেবে এরশাদকে চিনি। তবে ভাল-মন্দ দুটো দিকই ছিলো তার মধ্যে। ক্ষমতায় থাকার সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সারাদেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এরশাদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গনসহ গোটা রাজনৈতিক অঙ্গন কলুষিত হয়েছিল তার কিছু নেতিবাচক সিদ্ধান্তেরর কারণে। তবে ইতিবাচক কিছু কর্মকান্ডের কারণে ক্ষমতাচ্যুতির পরও রাজনীতিতে টিকে ছিলেন তিনি।

স্বৈরশাসক কিভাবে পল্লীবন্ধু হন? যদিও বিভিন্ন সময় এরশাদ দাবি করেছেন, আমরা মানুষ খুন করিনি, আমাদের হাতে রক্তের দাগ নেই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষির অবস্থা ভালো ছিলো না। এরশাদ ছুটে গেলেন কৃষকের ঘরে ঘরে। তাদের সার-বীজ-কীটনাশকের ব্যবস্থা করে দিলেন। কালোবাজারিদের জন্য হলেন কঠোর। কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান তার জন্য নিলেন নানা পদক্ষেপ। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন পল্লীর গণমানুষের বন্ধু। জাতির চোখে এরশাদ স্বৈরশাসক হলেও বৃহত জনগোষ্ঠির কাছে তিনি ছিলেন পল্লীবন্ধু।

১৯৮২ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি পাঁচটি শরিক দল এক হয়ে জাতীয় পার্টি তৈরি করেন। ৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হলে একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও মে: জে: (অব:) মাহমুদুল হাসানসহ অনেকেই এরশাদের সঙ্গ ছেড়ে দেয়। ফলে এরশাদকে বিপাকে পড়তে হয়। নেতাকর্মীদের বেঈমানির কারনে দল দুর্বল হতে থাকে। সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে এরশাদ।

জাতীয় পার্টির প্রচার ও প্রকাশনা সেল থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে এরশাদ বলেন, এক বিপর্যস্থ বাংলাদেশের দায়িত্ব আমাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। তারপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নয়টি বছর কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেখানে কতটুকু সফল হয়েছি বা বিফল হয়েছি- তার মূল্যায়ন করতে হলে পরবর্তী সময়ের সঙ্গে আমার আমলের যোগ বিয়োগ করার প্রয়োজন হবে। আমার মনে হয়, দেশের মানুষ সে অঙ্কটি নির্ভুলভাবে করতে পেরেছে। এরশাদ বলেন, আমি যেহেতু একজন সর্বক্ষণিক রাজনীতিবীদ সেহেতু আমার চিন্তা-চেতনা-ভাবনায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়ে থাকে। আমি ’৯০-এর ডিসেম্বরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং একজন প্রধান বিচারপতিকে বিশ্বাস করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়েছিলাম। তারপর উভয়পক্ষের রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ফলশ্রুুতিতে আমাকে জেলে যেতে হয়েছে। অতপর জনতার আদালতে আমি সুবিচার পেলেও ক্ষমতার আদালত আমাকে মুক্তি দেয়নি। একাধারে ছয় বছর জেলে দুর্বিসহ দিন কাটিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, আমার এই একান্ত প্রচেষ্টায় গড়া এক সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ আবার তামাটে হয়ে গেছে।

এই বইতে এরশাদ প্রথম ধাপে ২০৭টি উন্নয়ন কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরেন। আরেকটি ভাগে আরও ১৭৩টি উন্নয়ন কাজের বিবরণ দেয়া হয়। তার বইতে উল্লেখিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্যে রয়েছে – উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, জেলা-উপজেলা ভিত্তিক ৩ স্তরবিশিষ্ট বিকেন্দ্রীকরণমূলক প্রশাসন চালু, ৪৬০ থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা, গ্রাম সরকার পদ্ধতি বিলোপ, হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণ, প্রতি জেলায় মুন্সেফ কোর্ট, নারী নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তি, জাতীয় প্রেস কমিশন গঠন, আর্থিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফিতি হার হ্রাস, শিল্প-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, কৃষক ও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, শিক্ষা বিষয়ক পদক্ষেপ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নৌ যোগাযোগ, বিমান ও টেলিযোগাযোগ, পানি উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক ও খনিজ শক্তি, নির্মাণ কাজ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্প্রসারণ, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জাতীয় ঈদগাহ নির্মাণ, তিন জাতীয় নেতার মাজারের নির্মাণ কাজ, ওয়ারী খাল সম্প্রসারণ, ঢাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ট্রেনের নামকরণ। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত কারও কাছে ছিলো ইতিবাচক কারও কাছে নেতিবাচক।

যে যাই বলুন সাধারণ মানুষের মতে তার হাতে বাংলাদেশে উন্নয়নের কমতি ছিলো না, তিনি ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম করেছিলেন। তিনি রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবারকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছিলেন। তিনি মসজিদ মাদ্রাসার বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করেছিলেন। তিনি রেডিও, টিভিতে আজান প্রচারের নিয়ম প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি গুচ্ছগ্রামের প্রবর্তন করেছিলেন। তিনিই বলেছিলেন, ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।

বাাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত নাম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা দখল। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয় বছরের শাসন। অতপর রাজনীতিতে টিকে থাকা। তার রাজনৈতিক জীবনে ভালো মন্দ দুটোই রয়েছে। কোন কোন কাজের তীব্র সমালাচনা। আবার উন্নয়নসহ কিছু কাজ এখনও মনে রেখেছেন দেশের মানুষ। কারও কাছে স্বৈরশাসক আবার কারও কাছে পল্লীবন্ধু। তবে জাতি কেমন করে স্মরণ করবে এরশাদকে। স্বৈরশাসক নাকি পল্লীবন্ধু হিসেবে?

১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পায়। ১৯৯৬ সালে পায় ৩২টি, ২০০১ সালে ১৪টি ও ২০০৮ সালে মহাজোটে নির্বাচন করে জাপা ২৭টি আসন পায়। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ৩৪টি আসন পায় জাপা। সংরক্ষিত আরও ছয় আসন মিলিয়ে সংসদে বিরোধী দল গঠন করে জাতীয় পার্টি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২টি আসন পায় জাতীয় পার্টি। বিরোধী দলের নেতা হন এরশাদ। এ থেকেও দেখা যায় জাতীয় পার্টীর জনপ্রিয়তা কম ছিলনা।

এরশাদকে সরাসরি স্বৈরশাসক বলতে কেমন যেন বেমানান লাগে। কেননা প্রধান দুই দলের কাছেই পল্লীবন্ধুর গুরুত্ব কম ছিল না। কারন আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করেছে জাতীয় পার্টির এরশাদকে নিয়ে আবার বিএনপিও সাথে রাখতে কম চেষ্টার খবর শোনা যায়নি। সেহেতু বলা যায় এরশাদকে প্রয়োজনে সবাই কাছে পেতে চেয়েছে। তিনি যদি স্বৈরাচারী কমর্মকান্ড কওে থাকেন সেক্ষেত্রে তার সংস্পর্শে যাওয়াটা বিভিন্ন জোটের কতোটা উচিৎ হয়েছিল সেদিন? যেহেতু তার স্বৈরাচারীতার পাশাপাশি ভালো কিছু গুনও ছিলো। যার ফলে সে হয়েছিল পল্লীবন্ধু সেহেতু থাকনা তার পল্লীবন্ধু নামটা।

রেজাউল করিম লেখক: সংবাদকর্মী

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে