ভাষা শেখার জন্য ট্রাস্ট গঠন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

0
58


ভাষা শেখার জন্য ট্রাস্ট গঠন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী


বাংলাদেশের মাটিতে থেকে যারা বাংলা ভাষা ভুলে যেয়ে ইংরেজি উচ্চারণে কথা বলেন, তাদের প্রতি করুণা করা ছাড়া আর কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে বসবাস, যোগাযোগ, ব্যবসা-বানিজ্য, সংস্কৃতি বা সাহিত্য সম্পর্কে জানতে অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে। কিন্তু মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে নয়। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মধ্যে একটা হীনমন্যতা কাজ করে। নিজেদের ছেলে-মেয়েকে ইংরেজি মিডিয়ামে না পড়ালে চাকরি পাবে না, সমাজে চলতে পারবে না- অনেকেই এ ধরনের একটা মানসিক দৈন্যতায় ভোগে। অনেক ছেলে-মেয়ে বাংলা ভাষা বা নিজেদের এলাকায় কথা বলাটা ভুলে গিয়ে ইংরেজী উচ্চারণে বাংলা বলার চেষ্টা করে। মনে হয় যেন বাংলা ভাষাটা বলতে গিয়ে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। তাদের জন্য করুণা ছাড়া আর কিছু নেই।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিআরট্রিস কারডইন, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সহ কূটনীতিকরা। এর আগে বিকেল পৌনে ৩ টায় সেখানে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকুর রহমানের প্রতিকৃতি ম্যুরাল উন্মোচন করেন তিনি। এরপর সন্ধ্যায় জাতির পিতার জন্মশতবাষির্কী উদযাপন জাতীয় কমিটির কার্যালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মতো তো দূর্ভাগ্য কারো না। ৭৫ এর পর সব বাবা-মা সব হারিয়ে আমরা দুটি বোন রিফুজি হিসেবে বিদেশে ছিলাম। আমাদের এই সুযোগ হয়নি যে আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে শুরু থেকেই আমরা বাংলা মিডিয়ামে পড়াব। তাদেরকে পড়াতে হয়েছে বিদেশী স্কুলে, বিদেশের মাটিতে। তারপরেও আমরা চেষ্টা করেছি, তাদেরকে বাংলাভাষা শেখাতে। ঘরে সবসময় বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলেছি। তারপরেও তাদের ভাষায় যদি উচ্চারণের সমস্যা হয়, সেখানে দোষ দেয়ার কিছু নেই। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মিটিংয়ে যখন বক্তৃতা করি, তখন চেষ্টা করি ভালভাবে বাংলা বলতে। কিন্তু ঘরে যখন নিজেরা কথা বলি, তখন আমরা গোপালগঞ্জের ভাষা আর ঢাকার ভাষা মিলিয়েই কথা বলি। কারণ ছোটবেলা চলে এসেছি ঢাকা শহরে। সেই ভাষার একটা প্রভাব। টুঙ্গীপাড়ার মাটিতে জন্ম নিয়েছি সেই ভাষার প্রভাব। সবমিলিয়েই বলতে তো কোনো লজ্জা নেই। জাতির পিতাও তার ভাষণে গোপালগঞ্জের শব্দগুলি তিনি বলে গেছেন অকপটে।

বাংলা ভাষার প্রতি জাতির পিতার প্রীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পিকিংয়ে তিনি যখন শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন। তখন নয়াচীন ভ্রমণ করেন। সেই ভ্রমণকাহিনী তিনি লিখেছেন। ৫৪ সালে আবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। কারাগারে তিনি নয়াচীন ভ্রমণ নিয়ে লিখিছিলেন। তার সেই ডায়রীগুলো উদ্ধার করেছি। সেখানে জাতির পিতা লিখেছিলেন, পিকিংয়ে তাকে যখন শান্তি সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে দেয়া হয়, তিনি তখন বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম যখন জাতিসংঘে তিনি ভাষণ দেন, সেখানেও এই বাংলা ভাষাতেই ভাষণ দিয়েছিলেন। কাজেই বাংলাভাষাকে ৫২ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করেন জাতির পিতা। ১৯৯৬ সালে আমি যখন প্রথম সরকার গঠন করি। তখন থেকে এ পর্যন্ত যতকবার জাতিসংঘে গিয়েছি ততবারই জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করেই বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে আসছি।

অন্য ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে চাই। যার মাধ্যমে ভাষা শেখার জন্য বিভিন্ন ফেলোশিপ দেয়া হবে। যাতে বিভিন্ন ভাষা শেখা যায়। যারা অন্য ভাষা শিখতে চায়, কোন ভাষা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ইনস্টিটিউটেই ঠিক করে নেবে। যারা ভাষা শিখতে আসবে তাদের জন্য ফেলোশিপেরও ব্যবস্থা করা হবে। ইতোমধ্যে ৯ টা ভাষা দিয়ে একটা এ্যাপ তৈরী করা হয়েছে। সেটা যে কেউ ব্যবহার করতে পারে। তাছাড়া যেকোনো অনুবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জানারও একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ইউনেস্কো ক্যাটাগরী-২ ইনস্টিটিউট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এটার আরো উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি হোক, সেটাই আমরা চাই। যারা ভাষা শিখতে চায়, জানতে চায়, তাদের জন্য এটা সুখবর।

নিরক্ষতা দূর করতে মোবাইল ফোন একটা বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোবাইল ফোনের কী-বোর্ড এখন বাংলায় আছে। ফলে সাধারণ মানুষও এই মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করে। এমন কোনো শ্রেণী পেশার মান নাই যে এই মোবাইল ফোন ব্যবহান করে না। দেশে ১৬ কোটির ওপরে মানুষ আছে। ১৩ কোটি সিম ব্যবহার হয়। এখানে আরেকটা সুবিধা আছে, সেটা হলো মোবাইল ফোন ব্যবহার করা শিখতে গিয়ে, যাদের অক্ষরজ্ঞান কম আছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের অক্ষর জ্ঞান অর্জন করে নিচ্ছে। অনেকেই তাড়াতাড়ি শিখে নিচ্ছে এবং সেটা দিব্বি চালাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উদযাপনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মশতবাষির্কী। ক্ষণ গণণা শুরু হয়েছে। জন্মশত বার্ষিকী আমরা উদযাপন করতে যাচ্ছি। ২০২০ সালে মার্চ থেকে ২০২১ সালে মার্চ এই সময়টাকে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে আমরা যেটা শুরু করব, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে আমরা সূবর্ণজয়ন্তী পালন করব। তিনি বলেন, বাংলার জনগর আমারকে ভোট দিয়েছে। আমরা সরকার গঠন করেছি। আর এজন্যই আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে পারছি। ইউনেস্কো আমাদের সঙ্গে মুজিববর্ষ পালন করবে। এছাড়া বিশ^ব্যিাপি মুজিববর্ষ পালিত হবে। মুজিব বর্ষে আমরা প্রতিটি ঘর আলোকিত করব। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। জাতির পিতা যে দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন, সেই দেশে কোনো মানুষ গৃহহারা থাকবে না। অভুক্ত থাকবে না। বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাবে না। বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে। সেই বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্রমুক্ত।

এসএইচ



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে