ভোটার খরা কাটাতে নানা তৎপরতা আ.লীগে

0
41


ভোটার খরা কাটাতে নানা তৎপরতা আ.লীগে

ভোটকেন্দ্রে ভোটার খরা কাটাতে মনোযোগী এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে দলটির দুই মেয়র প্রার্থী মাত্র ১৬ ভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আর মোট ভোট পড়েছে ৩০ ভাগেরও কম। যা রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে দলের হাইকমান্ডকে। খোদ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকই ভোটারদের অনীহাকে গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয় বলে মন্তব্য করেছেন। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হাইকমান্ডও। ভোটার খরা কাটাতে বৈঠক হয়েছে দফায় দফায়। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামেও আলোচনা হবে।

এরইমধ্যে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ৫টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে কীভাবে ভোটার বাড়ানো যায়, সেদিকেই দৃষ্টি দিতে মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার মতে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছাতে পারলে তারা ভোটকেন্দ্রে আসবে। এ জন্য নেতাকর্মীদের কাজ করতে বলেন তিনি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটিতে ভোটার ছিল ৫৪ লাখের বেশি। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ছিল ৩০ ভাগেরও কম। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন-গুলোর মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অধিকাংশ সমর্থকই ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। আর ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থী মাত্র ১৬ ভাগ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত

হয়েছেন। অথচ আওয়ামী লীগেরই ভোট আছে প্রায় ৪০ ভাগ। এ নিয়ে চিন্তিত দলটি। ২০০১ সালে চরম ভরাডুবির মধ্যেও ৩৫ ভাগের বেশি ভোট পেয়েছিল আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভোটের রাজনীতিতে ভোটারদের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, যে ভোট পড়ার কথা ছিল তা হয়নি। আমাদের জনসমর্থন অনুযায়ী আরো বেশি ভোট আশা করেছিলাম। কেন তা হলো না- এ নিয়ে পার্টির ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আলোচনা হবে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ঢাকা সিটির নির্বাচনে নিজেদের দলের অনেক ভোটার ভোট দিতে আসেননি। তাদের মতে, টানা ১১ বছর ক্ষমতায় থাকায় দলীয় ভোটারদের মধ্যে আত্মবিশ^াস তৈরি হয়েছে, নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হবেই। সাধারণ ভোটারদের মাঝেও এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের অনেকেই ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। এই অবস্থা কাটিয়ে তুলতে এখন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে ভোটার বাড়াতে তৃণমূলের প্রতিটি সংগঠন শক্তিশালী করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

নেতাদের মতে, ঢাকা সিটিতে মেয়র প্রার্থীরা পাড়া-মহল্লায় মিছিল-সমাবেশ করে বক্তব্য দিলেও প্রকৃতপক্ষে ভোটারদের সঙ্গে নিজেরা সংযুক্ত হতে পারেননি। সমাবেশ বা প্রচারণায় নির্দিষ্ট কিছু নেতাকর্মী দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। ফলে সাধারণ মানুষ বা ভোটাররাও প্রার্থীদের কাছে ঘেষতে পারেননি। ভোটারদের নিরুৎসাহিত হওয়ার এটাও একটা কারণ। এছাড়া বেশিরভাগ নেতাকর্মীর প্রচারণা সেলফিবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাননি অনেকেই। মোট কথা খাজনার চেয়ে বাজনাই বেশি হয়েছে। আর এটাও ঠিক মেয়র প্রার্থীদের পক্ষেও সব ভোটারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তবে চট্টগ্রাম সিটি, ঢাকা-১০ আসনহ অন্যান্য আসনের উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে এবার ভোটারদের উৎসাহ দিয়ে কেন্দ্রে আনার বিষয়ের ওপর খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে ভোটারদের বুঝিয়ে ও উৎসাহ দিয়ে কেন্দ্রে আনার বিষয়ে থাকবে অসংখ্য টিম। যাদের কাজ হবে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বেশকিছু ওয়ার্ডে প্রার্থীদের বেশিরভাগই বিগত ৫ বছর কাউন্সিলর। তাদের নিজের আচার-আচরণ ও আশপাশের লোকদের কর্মকাণ্ডে মানুষ ছিল অসন্তুষ্ট। এবারো তাদের বেশিরভাগেই মনোনয়ন পান। এসব প্রার্থীর নিজেরও হারার শঙ্কা ছিল। এ শঙ্কা থেকেই তাদের সমর্থকরা ভোটার ও নিজ দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধামকি দিয়েছেন। এটাও নিরুৎসাহিত হওয়ার একটি কারণ। তাই আগামী নির্বাচনগুলোতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারেও কঠোর হাইকমান্ড। ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কোন্দল নিরসনে কেন্দ্র থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনী মাঠে থাকতে স্থানীয় প্রতিটি নেতাকর্মীকে কাজে লাগানো হবে।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনা সম্পর্কে দলটির উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের মতে, ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার কম উপস্থিতির কারণগুলো দলের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি শুরু থেকেই ইভিএম নিয়ে একটা নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাছাড়া আরো কিছু কারণ আছে। আমাদের দল সেগুলো আমলে নিয়েছে। চুলচেরা বিশ্লেষণও করছে, আরো করা হবে।

দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ভোটার উপস্থিতি কমের নানা কারণ ব্যাখ্যার পাশাপাশি উত্তরণের কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আমরা বেশকিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছি। এগুলো পার্টির সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনা হয়েছে। ওয়ার্কি কমিটির বৈঠকেও বিস্তারিত আলোচনা হবে। আগামীতে সব বাধা-বিপত্তি, নেতিবাচক প্রচারণা উপেক্ষা করে ভোটাররা যেন উন্মুক্ত পরিবেশে স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবমুখর হয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন, সে জন্য আমরা কৌশল নিয়েছি। সে ক্ষেত্রে যদি কোনো আইনের পরিবর্তন বা সংযোজনের প্রয়োজন হয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব। এছাড়া ভোটারদের সচেতন করতে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা সভার ব্যবস্থার কথাও আমাদের ভাবনায় আছে। সেইসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি, ঢাকা-১০ ও অন্যান্য আসনের উপনির্বাচনে কীভাবে ভোটার বাড়ানো যায়, তা নিশ্চিত করবে আমাদের পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান জানান, ঢাকা মহানগরীতে সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি দলীয় লোকজনও কেন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেননি, সে ব্যাপারটি আমাদের হাইকমান্ডকে ভালোই ভাবিয়ে তুলেছে। এ বিষয়ে দুই মহানগরীতে আমাদের শীর্ষ নেতা বা থানা পর্যায়ের যারা আছেন, তাদের গাফিলতি আছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এমএইচ



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে