রোজগার বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পরিবহন শ্রমিকরা

0
43


রোজগার বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পরিবহন শ্রমিকরা

বাস টার্মিনাল

খোঁজ নেন না মালিক ও সংগঠনের নেতারা
নীতিমালার শর্তে আটকা কল্যাণ ফান্ডের টাকা

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের সাধারণ ছুটির কারণে পরিবহন সেক্টরের প্রায় ৫০ লাখ কর্মী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। এদের মাসিক বেতন নেই, ঝুঁকিভাতা নেই, চিকিৎসা সেবা নেই; এমনকি করোনার এই চরম বিপর্যকালে ‘ত্রাণের ব্যবস্থাও’ নেই। শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য শত শত কোটি টাকার ফান্ড থাকলেও তা বিধিমালায় বন্দি হয়ে আছে। অসুস্থ শ্রমিকের চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে ‘বিধিমালা’ অনুযায়ী কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। সে কারণেই করোনা ভাইরাসের বিপর্যয়ের এই সময়ে ওই ফান্ড থেকে একটি টাকাও শ্রমিকদের দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার চাঁদার টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতারা একে অপরকে দোষারোপ করে চলছেন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, গত ২৬ মার্চ গণপরিবহন বন্ধ হওয়ার পর মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ অসহায় শ্রমিকদের খোঁজ নেয়নি। পরিবহন বন্ধ হওয়ার আগে মালিকরা সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কেউ কথা রাখেনি। অতীতের বিভিন্ন সময়ে লাগাতার হরতাল-অবরোধের মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘অর্থনীতির লাইফ লাইন’ যানবাহন চলাচল সচল রেখে সরকারকে সহযোগিতা করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। কিন্তু এই দুঃসময়ে তাদের দিকে সরকারও ফিরে তাকায়নি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে সরকারি প্রণোদনা থাকলেও পরিবহন সেক্টরের জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। তাছাড়া প্রতিদিন পরিবহন সেক্টরে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভাগের টাকাও শ্রমিকরা পায় না। মালিকরাই প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কখনোই মালিকদের বাইরে যেতে পারে না। বরং মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা চাঁদার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। তাই সংগঠনের ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা থাকে না, ফলে সাধারণ শ্রমিকদেরও সহযোগিতা মেলে না।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া বাসটার্মিনাল এলাকায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নূরু, মিজান, রফিকসহ বেশ কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক জানান, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কোনো আয়-রোজগার নেই। জমানো টাকা ফুরিয়ে গেছে। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা খোঁজ নেয় না। সরকারও এক কেজি চাল দিয়ে তাদের কোনো সহযোগিতা করছে না। আর শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য যে টাকা চাঁদা আদায় হয় তা মালিকরাই নিয়ে যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী জানান, ঢাকায় মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নামে যানবাহন থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয়। কিন্তু এই চাঁদার সব টাকাই কৌশলে মালিকরা নিজেদের পকেটে নিয়ে নেন। একারণে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে গুলিস্তান-মিরপুর রুটের মিনিবাসের চালক শহিদুল জানান, গাড়ি না চললে টাকা নাই। এখন মালিকরা টাকা দেয়া তো দূরের কথা করোনার ভয়ে দেখা পর্যন্ত করে না। ফোনও ধরে না।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, শ্রমিকরা কাজ না করলে আমরা মালিক থাকতাম না। বাস না চলায় পরিবহন শ্রমিকরা একেবারে বেকার হয়ে পড়েছেন। রোজগার না থাকায় তারা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। আমি আমার পরিবহনের শ্রমিকদের সহযোগিতা করেছি। কর্মহীন শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য অন্য মালিকদেরও আমি অনুরোধ করেছি। তাছাড়া শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বিশেষ প্রণোদনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মালিকরা কখনোই শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তাদের কোনো কাজেও হস্তক্ষেপ করে না। এই অভিযোগ কেউ করে থাকলে সে মিথ্যা বলেছে। খন্দকার এনায়েত উল্লাহ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন- শ্রমিক ফেডারেশনের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করলেও তা শ্রমিকদের জন্য ব্যয় হয় না। এই টাকা কোথায় যায়?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আপদে-বিপদে পরিবহন শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর শ্রমিক কল্যাণ তহবিল নামে তিনটি ফান্ড রয়েছে। কিন্তু সেই ফান্ড থেকে এই বিপর্যয়কালে সহযোগিতার জন্য একটি টাকাও খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরকারের ‘বিধিমালার’ আলোকেই এসব ফান্ড থেকে টাকা খরচ করা হয়। তাই করোনা সংকটকালে এসব ফান্ড থেকে শ্রমিকরা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে বাস, ট্রাক, পিকআপভ্যান চালকদের একাধিক সংগঠন সারাবছরই যানবাহন থেকে বৈধ ও অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে। এছাড়া বাসটার্মিনাল কেন্দ্রিক বড় ধরনের চাঁদাবাজি তো রয়েছেই। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাদের ফান্ডে টাকা থাকে না। ফলে বির্পযয়ের সময় এসব সংগঠন থেকে শ্রমিকরা কোনো আর্থিক সহযোগিতা পান না।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. মো. রেজাউল হক জানান, নীতিমালার বাইরে ফাউন্ডেশনের ফান্ড থেকে কোনো শ্রমিককে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় না। ৪১০ কোটি টাকা জমা আছে। নীতিমালা বা বিধিমালা অনুযায়ী রোগাক্রান্ত, দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। নীতিমালা সংশোধন ছাড়া করোনা ভাইরাসের দুরবস্থাকালে শ্রমিকদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়া সম্ভব না।  এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এখনো কার্যকর হয়নি। ওই তহবিলে দেড় কোটির মতো টাকা রয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানীতেই পরিবহন থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। ৫০০ থেকে প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় হয়। মাস শেষে চাঁদার পরিমাণ কোটি কোটি টাকায় হিসাব হয়। কিন্তু শ্রমিকরা এই চাঁদার টাকার ভাগ পায় না। পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতা, পুলিশ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এই টাকার ভাগ পায়। প্রকৃত শ্রমিকদের কল্যাণে এই টাকা ব্যয় হয় না। এ কারণেই এই করোনার সময়েও শ্রমিকরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, অর্ধাহারে-অনাহারে থাকছেন। অথচ কেউ তাদের খোঁজ নেয় না, সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েও কথা রাখেন না কেউ।

এমআই



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে