খামখেয়ালির বলি ৩২ যাত্রী

0
9


খামখেয়ালির বলি ৩২ যাত্রী

* প্রতিমন্ত্রী বলছেন হত্যাকাণ্ড
* তদন্তে ৩ কমিটি গঠন
বুড়িগঙ্গায় মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনার পেছনে দুই লঞ্চের চালকেরই বেপরোয়া মনোভাব কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেননা, দুর্ঘটনার অনেকক্ষণ আগে থেকেই লঞ্চ দুটি খুব কাছাকাছি চলছিল এবং তাদের গতিও ছিল অনেক বেশি। ফলে ঘাটে ভেড়ার জন্য মর্নিংবার্ডকে অতিক্রম করতে গিয়ে ময়ূরী-২ সরাসরি উঠে যায় লঞ্চটির ওপর। মুহূর্তেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বুড়িগঙ্গার শ্যামবাজার এলাকায় ওই দুর্ঘটনায় ৩২ জনের করুণ মৃত্যু ঘটে। যাদের মধ্যে ২১ জন পুরুষ, আটজন নারী ও তিন শিশু রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি ঘাট থেকে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ছোট লঞ্চ এম এল মর্নিংবার্ড ৫০-৬০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। সেটির সদরঘাটের ১৩ নম্বর পন্টুনে ভেড়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, কেরানীগঞ্জ এলাকায় ভিড়িয়ে রাখা লঞ্চ এম ভি ময়ূরী-২ লালকুঠি ঘাটে আসছিল চাঁদপুরগামী যাত্রী নেয়ার জন্য। দুটি লঞ্চের পন্টুনই পাশাপাশি, শুধু মাঝখানে একটা খেয়া ঘাট। কিন্তু শ্যামবাজার এলাকায় ময়ূরীর ধাক্কায় মর্নিংবার্ড লঞ্চটি দুই ভাগ হয়ে পুরোপুরি ডুবে যায়। তবে ময়ূরীর তেমন ক্ষতি হয়নি। দুর্ঘটনার পর চালক ও সহকারীরা পালিয়ে যায়। লঞ্চটিকে আটক করেছে নৌপুলিশ।
এত কাছাকাছি দ্রুত গতিতে লঞ্চ চালানোর কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে বিআইডব্লিউটিএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ভিডিওটিতে দেখা যায়, দ্রুত গতিতে অতিক্রম করতে গিয়েই মর্নিংবার্ডকে ধাক্কা দেয় ময়ূরী-২। আবার খেয়াল করলে এও দেখা যায়, মর্নিংবার্ডের গতিও সে সময় অনেক ছিল। অর্থাৎ সেটিও পাল্লা দিয়ে আগে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কোনো চালকই নিয়মের তোয়াক্কা করেননি বলে মনে হচ্ছে।
তবে বেপরোয়াভাবে লঞ্চ চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত নয় বলে

জানিয়েছেন লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল কর্তৃপক্ষের (যা-প) সচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই আমরা চালকদের খুঁজে পাচ্ছি না। বিষয়টি তদন্তের পর জানা যাবে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ময়ূরী লঞ্চের মালিকের নাম মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ। তার আরো কয়েকটি লঞ্চ রয়েছে। আর জয়নাল আবেদীন লিলু ও আবদুল গফুর যৌথভাবে মর্নিংবার্ড লঞ্চের মালিক। দুটি লঞ্চেরই কাগজপত্র হালনাগাদ রয়েছে। মর্নিংবার্ডের সুকানির নাম রোস্তম আলী। ময়ূরীর মাস্টার আবুল বাসার মোল্লা। তবে ওই সময় তারা লঞ্চ চালাচ্ছিলেন কিনা তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ এখন তাদের খুঁজছে।
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্টরা উদ্ধার কাজে ছুটে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একে একে মৃতদেহ নিয়ে পানি থেকে উঠতে থাকে ডুবুরির দল। এ সময় নদীর দুই তীরে হাজারের মানুষের দীর্ঘশ্বাসে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। দুপুর আড়াইটার মধ্যে ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পরপরই দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদেরও মৃত ঘোষণা করেন। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২।
এদিকে, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ রওনা দিলেও সেটি বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুর (পোস্তগোলা) কাছে এসে আটকে যায়। বর্ষায় নদীতে পানির উচ্চতা বেশি থাকায় জাহাজটি সেতুর নিচ দিয়ে আসতে পারেনি বলে জানান বিআইডব্লিটিএর উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি জানান, এরপর দেশীয় পদ্ধতিতে লঞ্চটি উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
লঞ্চ দুর্ঘটনার পর বিকাল সোয়া ৩টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। প্রাকৃতিক কোনো বৈরী পরিবেশ নয়, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নয়, তবুও শুধু চালকের খামখেয়ালিতে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল। আমি মনে করি, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।
দুর্ঘটনা তদন্তে ৩ কমিটি : এ দুর্ঘটনা তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবংবিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে সাত সদস্যের কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীনকে। চার সদস্যের এ কমিটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। আর সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের তিন সদস্যের কমিটি প্রতিবেদন জমা দিবে ১৫ দিনের মধ্যে।
নিহতদের অর্থ সহায়তা : লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের দাফন বা সৎকারের জন্য ১০ হাজার করে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গের সামনে এ টাকা হস্তান্তরের জন্য একটি ডেস্ক স্থাপন করে বিআইডব্লিউটিএ। এছাড়া উত্তরাধিকারী নিশ্চিত হওয়ার পর প্রত্যেক মৃতব্যক্তির জন্য দেড় লাখ টাকা দেয়া হবে। নৌযাত্রীরদের কল্যাণ ফান্ড থেকে এ টাকা দেয়া হবে বলে জানান বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক আলমগীর করিব। সদরঘাটে যাত্রী প্রবেশ ফি থেকে দুই টাকা ও লঞ্চ মালিকদের কাছ থেকে যাত্রী প্রতিবছরে ১০ টাকা করে এ ফান্ডে টাকা জমা হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।

এসএইচ



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে