ডা. সাবরিনার খুঁটির জোর পিএম অফিসের কর্মকর্তা!

0
37


ডা. সাবরিনার খুঁটির জোর পিএম অফিসের কর্মকর্তা!

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রতারক সাহেদের পরই জেকেজি করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এখন টক অব দ্যা কান্ট্রি। তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন বিভিন্ন চ্যানেলের টকশোসহ দেশজুড়ে। প্রশ্ন উঠছে, অনেক প্রতিষ্ঠান থাকতেও অখ্যাত একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারের (জেকেজি) সঙ্গেই কেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা নমুনা সংগ্রহের চুক্তি করল? যখন তাদের লাইসেন্সই ছিল না! অবশ্য তড়িঘড়ি করে চুক্তির দুই মাস পর জেকেজি লাইসেন্স নেয় বলে জানা যায়। এ ছাড়াও জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবরিনা কীভাবে এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেন। তাহলে কি সাবরিনার প্রভাব বলয় অনেক বড় ও অনেক প্রভাবশালীদের সঙ্গেই তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যার ফলেই এসব কাজ করে গেছেন তিনি বিনা দ্বিধায়। তবে জেকেজির চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন প্রশ্নের উত্তর মিলতে শুরু করেছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (পিএমও) সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাই ডা. সাবরিনা চৌধুরীর অন্যতম একজন পৃষ্ঠপোষক। তার অনেক ঘনিষ্ঠ তিনি। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ও এডিজি তাদের পরীক্ষার জালিয়াতির বিষয়গুলো জানতেন। এর পরেও তারা কেন ব্যবস্থা নেয়নি। এমন নানা অসংগতিগুলো খতিয়ে দেখছেন তারা। ঊর্ধ্বতন ওই ব্যক্তি নজরদারিতে রয়েছেন। অসংগতিগুলো মিলিয়ে আনতে পারলেই ছাড় পাবে না কেউ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে যে, ডা. সাবরিনা ২৪তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার হলেও ২৭তম বিসিএস উত্তীর্ণদের সঙ্গে নিয়োগ পান। ৩৩ম বিসিএস উত্তীর্ণদের একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছিলেন তিনি। আর ওই অনুষ্ঠানটির আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন ওভাল গ্রুপ লিমিটেডের নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম। ওই ফার্মটিরই প্রধান নির্বাহী ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। সেখানেই তাদের পরিচয় হয়। সেখান থেকেই পরিণয় ও বিয়ে। এর পরেই এই প্রতিষ্ঠানটি ফুলেফেপে ওঠে। এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ ইভেন্ট প্রায় এককভাবে করেছিল। যদিও ওই প্রতিষ্ঠানটির এই ধরনের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামের কোম্পানিরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান জেকেজি। আর প্রতিষ্ঠানের প্রধান আরিফুল হলেও চেয়ারম্যান ছিলেন সাবরিনা। সাবরিনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দিবসের কাজ পেয়ে আসছিল এই ওভাল গ্রুপ। এ ছাড়াও আরিফ সাবরিনাকে বিয়ে করেছিলেন মূলত তার ওভাল গ্রুপের ব্যবসা প্রসারের জন্যই। কারণ সাবরিনার যে ধরনের যোগাযোগ ছিল তা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এই হিসাব-নিকেশ করেই আরিফ সাবরিনাকে বিয়ে করেন ও সাবরিনার শর্ত ছিল যে, এই এভেন্টগুলো থেকে যে আয় হবে তার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে পাবেন। এ ছাড়াও সাবরিনার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে একজন প্রভাবশালী চিকিৎসকের নাম উঠে এসেছে, যিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পোস্টিং পাইয়ে দিতে ও অফিস না করে অন্য ব্যবসা-বাণিজ্য যেন দেখতে পারেন ও সে বিষয়ে কেউ যেন তাকে প্রশ্ন না করতে পারে সেসব ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করতেন।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেজগাঁও জোনের এক কর্মকর্তা প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, ডা. সাবরিনা জেকেজির চেয়ারম্যান নন, বিষয়টি স্বীকার না করলেও প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা তার মোবাইল ফোনে একাধিক ক্ষুদে বার্তায় দেখেছি তিনি নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে কয়েকটি জায়গায় বার্তা পাঠিয়েছেন। এ ছাড়াও ওভাল গ্রুপ লিমিটেড কোম্পানিরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান জেকেজি। তাই তার দায় এড়ানোর সুয়োগ নেই। যদিও ডা. সাবরিনা খুব চতুর। তিতুমীর কলেজে সংঘর্ষের ঘটনার পর তিনি আঁচ করতে পারেন যে কোনো সময় ফেঁসে যেতে পারেন। তখনই তার স্বামী প্রধান নির্বাহী তাকে বরখাস্ত করেন। তবে এখানেও একটি বিষয় প্রধান নির্বাহী কীভাবে একজন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করতে পারেন। এটি হয়তো তারা করেছিলেন ফেঁসে গেলেও ডা. সাবরিনা বাইরে থাকলে প্রভাব খাটিয়ে আরিফুলের জন্য কিছু করতে পারবেন।

এদিকে রিমান্ডে আনার পর গত সোমবার রাতেই ডা. সাবরিনাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ গোয়েন্দা শাখা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে। এখন থেকে জেকেজি করোনা পরীক্ষা ফলাফল কেলেঙ্কারি মামলার তদন্ত তারাই করবে। জেকেজির ভুয়া করোনা টেস্ট রিপোর্টের ঘটনা ক্রসচেক করতে ডিবি এই মামলায় ডা. সাবরিনার স্বামী আরিফুল চৌধুরীকে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এ কারণে গতকাল ডিবি পুলিশ আরিফুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। রিমান্ডের এই আবেদন আজ বুধবার ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানি হবে। তেজগাঁও বিভাগের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা গতকাল বলেন, গত সোমবার রাতেই তাকে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। ডা. সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রসঙ্গত, গত ২২ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের সাবেক গ্রাফিক ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে কোভিড-১৯ পরীক্ষার নকল সনদ তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কম্পিউটার থেকে ৪৩টি সনদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে চার জন প্রবাসীও রয়েছে। হুমায়ুন ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের পর জেকেজির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। পরে ২৫ জুন প্রতিষ্ঠানটির সিও আরিফুল চৌধুরীসহ আরো ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরেই আলোচনায় আসেন ডা. সাবরিনা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেকেজি হেলথ কেয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ২৭ হাজার করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি মনগড়া ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন। বাকি ১১ হাজার ৫৪০টি রিপোর্ট দিয়েছে আইইডিসিআরের মাধ্যমে। জেকেজির গুলশানের অফিস থেকে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৮ কোটি টাকা। করোনার রিপোর্ট জালিয়াতির কারণে সাবরিনা চৌধুরীর স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশন। তারা এখন কারাগারে আছেন। গত রবিবার দুপুরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে আনা হয়। পরে তাকে তেজগাঁও থানায় করা জেকেজির প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ জানায়, সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে একটু বিলম্ব হয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি সেগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তাই তাকে আগের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান। তবে সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান নয় প্রতিষ্ঠানটির কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক দাবি করে আসছিলেন।

ডিসি



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে