থমকে গেছে রোহিঙ্গা ফেরানোর প্রক্রিয়া

0
33


থমকে গেছে রোহিঙ্গা ফেরানোর প্রক্রিয়া

থমকে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যবাসনের সব প্রক্রিয়াই। মিয়ানমারের বারবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, একের পর এক শর্ত ভঙ্গ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে ভেস্তে যাচ্ছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। প্রাণঘাতী মহামারির কারণে আড়ালে পড়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। এই করোনাকালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় হিমশিম বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে শিগগিরই কোনো আশার আলোও দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। আর উভয় দিকেই সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনসহ নানা কারণে ১৯৭৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পালিয়ে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। কয়েক দফা বৈঠকের পরও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি কাক্সিক্ষত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার। রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে কমে আসছে আন্তর্জাতিক সহায়তাও। ফলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংকট আরো গভীর হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এদিকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে টালাবাহানা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাখাইনে নতুন করে দমন-পীড়ন ও কথিত ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তাদের ভাষায় ‘সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি’র বিরুদ্ধে পরিচালিত এ অভিযানের ভয়ে হাজার হাজার মিয়ানমার নাগরিক রাখাইন ছেড়ে পালিয়েছে, এখনো পালাচ্ছে। এরফলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পরিবর্তে আরো জটিল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ভোরের কাগজকে বলেন, প্রত্যাবাসন সহজ নয়। মিয়ানমার বন্ধু রাষ্ট্র। বারবার বলছে নিয়ে যাচ্ছে। শর্ত মেনে নিয়ে যেতে বলছি। কিন্তু তারা শর্ত পূরণ করেনি। এই মুহ‚র্তে রাখাইনে যুদ্ধ চলছে। নৃ-গোষ্ঠীরা ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এদিকে মিয়ানমার সরকার নিজের লোক নিয়ে একের পর এক তদন্ত কমিশন করছে। সম্প্রতি ৩৫ জন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন করেছে যেখানে বিদেশি বিশেষজ্ঞ মাত্র দুজন। বোঝাই যাচ্ছে এতে ফল কি হবে? মিয়ানমার বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ^ নেতারা একদিকে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন; অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসাও করছেন চুটিয়ে। ইতোমধ্যে ইউরোপের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যবসা বেড়েছে ১৫ গুণ, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিন গুণ। এটি অবশ্যই তাদের ডাবল স্ট্র্যান্ডার্ড আচরণ। এরপরও প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমারের ওপর জোরালো চাপ রাখতে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে ক‚টনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ।

এদিকে চলতি ৪৩তম অধিবেশনে (২৩ জুন) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে পাস হয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রস্তাব। ‘মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি মানবাধিকার পরিষদের ৪৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ৩৭টির ভোটে গৃহীত হয়। প্রস্তাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ায়

বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানানো হয়েছে ওই প্রস্তাবে। পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ ভ‚মিতে ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে জেনেভার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পক্ষে এলেও প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যেই এই প্রস্তাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবাস্তব আখ্যা দিয়ে একে প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার।
এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির ভোরের কাগজকে বলেন, প্রত্যাবাসন না হওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। বাড়ছে আঞ্চলিক সংকটও। মিয়ানমারে তেল-গ্যাস পাওয়া গেছে। এজন্য চীন-ভারত মিয়ানমারকে কিছু বলে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিশ্চুপ। ইউএনডিপি, আইএমএফ কিছুই বলছে না। সম্প্রতি ওআইসির কনফারেন্সে (জুম) আমি বিষয়টি তোলার চেষ্টা করেছি; কিন্তু সবাই কোভিড-১৯ নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, জেনেভায় প্রত্যাবাসন প্রস্তাব গৃহীত হওয়া ভালো দিক। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কী হয় দেখি। তবে শিগশিগরই প্রত্যাবাসন হবে বলে মনে করেন না সাবেক এই ক‚টনীতিক।

রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে গত ২২ জানুয়ারি গাম্বিয়ার দায়েরকৃত মামলায় মিয়ানমারকে চারটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। সেইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, পরবর্তী চার মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইসিজের নির্দেশ বাস্তবায়নেও নানা গড়িমশি ও কূটকৌশলের আশ্রয় নেয় মিয়ানমার সরকার। অন্যদিকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় অং সান সু কিসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার আদালতে মামলা হয়েছিল গত বছরের ১৪ নভেম্বর। ওই মামলা দুটি ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আর কোনো অগ্রগতি নেই এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। আর এমন নয়, গাম্বিয়া ও আর্জেন্টিনার মামলা দুটি জিতে গেলেই পরদিন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে চলে যাবে। তিনি বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গার কী হবে এটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্মহারও বেশি। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশ। এত বড় বোঝা বয়ে বেড়ানো অসম্ভব। ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদি গণহত্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। গণহত্যাকারীদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে মিয়ানমার যত উদ্ভট যুক্তিই দিক, আমাদের আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।

ডিসি



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে