সুষ্ঠু তদন্ত চান স্বাস্থ্যকর্মীরা

0
8


সুষ্ঠু তদন্ত চান স্বাস্থ্যকর্মীরা

ঢামেকে এক মাসে খাবারের বিল ২০ কোটি টাকা!

করোনার এই দুর্যোগে পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী), এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে দুর্নীতির পর এবার সামনে এসেছে আরেক দুর্নীতির চিত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সেবাদানকারীদের এক মাসের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাজেট চেয়েছেন ২০ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কটা দেখে অনেকেরই চোখ উঠেছে কপালে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ব্যয়ের হিসাব কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমরা তদন্ত করে দেখছি খাওয়ার বিল এত অস্বাভাবিক কেন হলো? এখানে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে আমরা তার ব্যবস্থা নেব। এদিকে ঢামেক কর্তৃপক্ষের এমন হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝেও। তারা এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত চান।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল মঙ্গলবার সংসদে দাবি করেন, ঢামেক হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়ার বিষয়ে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা সঠিক নয়। তিনি বলেন, আমি এই বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। কাল রাতে আমি এটা দেখেছি। ৫০টি হোটেল ভাড়া হয়েছে। সেখানে তিন হাজার ৭’শ মানুষ একমাস থেকেছেন। প্রত্যেকটি রুমের ভাড়া ১১০০ টাকা। খাওয়ার খরচ যেটা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সেখানে দিনের তিনটি মিলের জন্য ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে বাজেট প্রাক্কলন, অনুমোদনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক দফা অনিয়ম হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই বাজেটকে ত্রু টিপূর্ণ বলেও পরে কিভাবে অনুমোদন দিল, অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ বরাদ্দ দিল, সেই প্রশ্নের উত্তরটাই জানা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনার এই আপদকালে একটি আলাদা কোড করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচালকদের অর্থ খরচ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, গত ২ মে ঢামেক হাসপাতালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ভর্তি শুরু হয়। সেই থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত দুই হাজার চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের থাকা-খাওয়া-যাতায়াতের জন্য ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ চায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সাত দিন ডিউটির পর ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনের হিসাবে দুই হাজার কর্মীর ২১ দিনে ২০ কোটি টাকা খরচ হলে কর্মীপ্রতি খরচ দাঁড়ায় এক লাখ টাকা। দৈনিক হিসেবে পড়ে চার হাজার ৭৬২ টাকা। এর মধ্যে খাবারের ৫০০ টাকা বাদ পড়লে শুধু থাকা ও পরিবহন খরচ বাবদ দৈনিক খরচ চার হাজার ২৬২ টাকা। কোভিড চিকিৎসার শুরুতে ঢামেক হাসপাতালকে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর বাইরে আর কোনো টাকা এখনো খরচ করা হয়নি। এখন বিল তৈরি হচ্ছে। নতুন টাকা বরাদ্দ পেলে সেখান থেকেই বিল পরিশোধ করা হবে।

ঢামেক হাসপাতাল-২, বার্ন ইউনিট ও রেলওয়ে হাসপাতাল এই তিনটি হাসপাতাল ঢামেক হাসপাতালের অধীনে। ২০ কোটি টাকার হিসাবে এই তিন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনারসহ দুই হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর হোটেলে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের বিল ধরা হয়েছে। চিকিৎসকদের রিজেন্সি, লা ভিঞ্চি, লেক শোর, গোল্ডেন টিউলিপ এমন কয়েকটি অভিজাত হোটেলে রাখা হয়। নার্সদের রাখা হয়েছে হোটেল সুন্দরবন, হোটেল নিউইয়র্ক, হোটেল লা ভিলা ওয়েস্টার্ন, হোটেল সাফারি, হোটেল ওসমানিয়া ইন্টারন্যাশনাল, রহমানিয়া ও হোটেল সেন্ট্রাল পয়েন্টে।
এ প্রসঙ্গে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরউদ্দিন জানান, তারা যে ব্যয় করেছেন, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ীই করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট দেখেই তা পাস করেছে। কোন অসঙ্গতি থাকলে তারা তা অনুমোদন দিত না। এই টাকা তারা বরাদ্দ পেয়েছে দুই মাসের খাবার, যানবাহন, হোটেল ভাড়ার জন্য। যা এখনো খরচ হয়নি। বিল পেলে সেই অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করা হবে। আর টাকা খরচ না হলে তা সরকারি কোষাগারেই থাকবে।

এদিকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে আজ বুধবার সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢামেকের এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে জানান, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলার পর থেকে বেশ চাপে আছেন কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে পরিচালকের কক্ষে। শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, এর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও জড়িত।

অন্যদিকে ঢামেকের চিকিৎসাকর্মীদের থাকা-খাওয়ায় ২০ কোটি টাকা খরচের খবর প্রকাশের পর হোটেল রিজেন্সিতে অবস্থানরত ডা. তারিক আহসান তার ফেসবুকে সেখানকার খাবারের মানহীনতার কথা উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হোটেল রিজেন্সির খাবার। রং দেখে খাবারের মান বোঝা যাবে না। মান বুঝতে হলে স্বাদ নিতে হবে। খাবার খাওয়াকে তারা অত্যাচারের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে বাঁচি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলশানের হোটেল স্ট্রিং হিলে অবস্থানরত একজন চিকিৎসক বলেন, হোটেলের হিসাবটা আলাদা। খাবার-দাবারের মান একেক হোটেলে একেক রকম। এটা নির্ভর করে আমরা আসলে কোথায় অবস্থান করছি। এখানে দুই লিটার একটি পানির বোতলের দাম রাখা হয় ১২০ টাকা, যা বাইরে মাত্র ত্রিশ টাকা। আমাদের খাবারের মান মোটামুটি ভালো। তবে খাবার বাবদ যত খরচ দেখানো হয়েছে, এত আসার কথা না। আমাদের সকালের নাস্তায় দুটি পরোটা, একটি ডিম ও সবজি থাকে। এতে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা আসতে পারে। দুপুরে এক প্লেট ভাত, ভর্তা, ডাল আর মাছ অথবা মুরগির মাংস দেয়া হয়। এজন্য সর্বোচ্চ আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ টাকা বিল হতে পারে। এভাবে রাতের খাবারে সমপরিমাণ খরচ হবে। এ হিসাবে দিনে সর্বোচ্চ সাত থেকে ৮শ’ টাকা আসতে পারে। সেখানে দিনে দেড় হাজারের উপরে খরচ দেখানো হয়েছে, এটা অকল্পনীয়।

হোটেল ওসমানীতে থাকা ঢামেক হাসপাতালের নার্স তমাল মাহমুদ ভোরের কাগজকে বলেন, খেতে হয়েছে তাই ওই খাবার খেয়েছি। আর পরিমাণের কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলতে হবে, সবজির পরিমাণ এমন ছিল যে মাত্র দুই লোকমা ভাত খাওয়া যেত। ছয়জনের মাইক্রোবাসে গাদাগাদি করে আমরা আটজনও গিয়েছি। কিন্তু যে খরচ দেখানো হচ্ছে তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে তো প্রশ্ন উঠবেই।

ঢামেক হাসপাতালের নার্সিং সুপারেনটেন্ড শিখা বিশ্বাস ভোরের কাগজকে জানান, হাসপাতালের নার্সদের অনেকেই হোটেলের খাবারের মান ও থাকা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। তবে সবাই না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. মো. শাহেদ রফি পাভেল ভোরের কাগজকে বলেন, একজনের তিন বেলা খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ ৫’শ টাকা। কিন্তু ঢামেক কর্তৃপক্ষ যে টাকার হিসাব দিচ্ছে তাতে একেকজন প্রতিবেলায় বুফে খেতে পারতেন। বিভিন্ন হোটেলে রাখা চিকিৎসকদের মাসব্যাপী কি কি খাওয়ানো হয়েছে, তা আমরা দেখেছি। তাদের যে মানের খাবার দেয়া হয়েছে, তাতে ২০ কোটি টাকা কিভাবে খরচ হলো? আমরা কোনোভাবেই এটি মানতে পারছি না। ভুতুড়ে এ বিলের বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।

আর সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি এন্ড রাইটসের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির মাহমুদ ভোরের কাগজকে বলেন, এই বিল আসলেই আশ্চর্যজনক। নার্সদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা ছিল তা দেয়া হয়নি। কয়েকটি হোটেল নিম্নমানের। আমরা যে ব্যয় শুনেছি তা যদি সঠিক হতো তাহলে নার্সদের আরো ভালো মানের হোটেল ও খাবারের ব্যবস্থা করা যেত। সরকারে উচিত বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া।

ডিসি



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে