স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

0
18


স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

কী শিক্ষা দিল করোনা- ১

বিগত ১০-১২ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সারাবিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, করোনা সংক্রমণের কয়েক মাসেই তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে অনেক হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক, নার্সসহ নিয়োগ হয়েছে হাজার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী। কেনা হয়েছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। কিন্তু করোনা মহামারি শুরুর পর দেখা গেল এত কিছুর পরও হাসপাতালগুলোতে নেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা। নেই আইসিইউ সুবিধা। প্রশিক্ষিত জনবলের সংকটও প্রকট। রাজধানীর নামিদামি হাসাপাতালগুলোরই যখন এমন দৈন্যদশা, তখন সারাদেশের চিত্র সহজেই অনুমেয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য খাত এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অসাড়তা দেখিয়ে দিয়েছে। এখনই এ খাতের দিকে বিশেষ নজর দেয়া উচিত। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন হাসপাতালে কিছু ক্ষেত্রে লজিস্টিক সুবিধা বাড়লেও এখনো ঘাটতি আছে অনেক। করোনাকালে সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের যে দুর্বলতা ফুটে ওঠেছে, সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তা সমাধানে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের পরিচালনাসংক্রান্ত বিভাগে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা নিয়োগ না দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের শিক্ষিত ও পেশাজীবীদের নিয়োগ দেয়া দরকার। রাজধানী কিংবা শহর কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। জোর দিতে হবে গবেষণা কাজেও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ মনে করেন, করোনা মহামারি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে যে সুষম বা সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন সেই শিক্ষা দিয়েছে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, সক্ষমতা রাতারাতি বাড়বে না। তবে যেখানে এত দিন কম মনোযোগ দেয়া হয়েছে, সেখানে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এতদিন মনে করা হতো সংক্রামক ব্যাধি কমে গেছে। কিন্তু করোনা মহামারি প্রমাণ করেছে তা সত্য নয়। অপ্রিয় হলেও এটা সত্য যে, সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে দুর্বলতা আছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক এই অধ্যক্ষ আরো বলেন, কোভিড-১৯ দুর্যোগের এ সময়টিতে দেখলাম সরকারি হাসপাতাল হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। যারা স্বাভাবিক সময়ে দেশে চিকিৎসার কথাটি চিন্তাও করতে পারতেন না, তারাও সরকারি হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। তাই সর্বজনীনভাবে ব্যবহারের জন্য সরকারি হাসাপাতালের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবস্থাপনার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা মহামারি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যতা কতটা। এখনই যদি আমরা এদিকে নজর না দেই তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের আরো বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। তবে মহামারির এ সময়ে লজিস্টিক কিছু বিষয়ে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। আমরা এই মহামারি পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে মোকাবিলা না করে প্রশাসনিকভাবে করতে চেষ্টা করেছি। যা ছিল সম্পূর্ণই ভুল পদ্ধতি। এ খাতে আমলা নির্ভরতা কমাতে হবে।

মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. চিন্ময় দাস মনে করেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, অল্প কিছু কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ছাড়া এই করপোরেট অর্থনীতির যুগে সারা বিশে^র চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনোটাই জনবান্ধব না। অন্যসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মতো চিকিৎসায়ও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। যার চূড়ান্ত লক্ষ্য মুনাফা অর্জন। এ নিয়ে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, তারা হয় সমস্যাকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যান অথবা তাদের অন্য কোনো মতলব আছে। মনে রাখতে হবে, হাসপাতাল মানে কতগুলো বড় বড় বিল্ডিং নয়।

ডা. চিন্ময় দাস আরো বলেন, একটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সে দেশের মানুষের বেড়ে উঠার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তা বুঝতে হলে সে দেশের ভৌগোলিক কাঠামো, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে এ দেশের মানুষ অসুস্থতার কারণ এবং তার প্রতিকারের কারণ অনুসন্ধান করে চলেছে। কালে কালে পীর-ফকির-পুরুত-কবিরাজ গাছ-গাছড়াসহ তাদের আবিষ্কৃৃত নানা চিকিৎসা পদ্ধতি দিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। তার সবই যে মঙ্গলজনক ছিল তা নয়। এদের জায়গা ছিল মানুষের মনের গভীরে। এই ভাবনা যে এখনো নেই, তা কিন্তু নয়। ব্রিটিশরা যখন এ দেশে আসে তখন তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে যে চিকিৎসা পদ্ধতি, তা শুধু তাদের জন্যই ছিল। সেখানে এ দেশের জনসাধারণের অধিকার ছিলই না। এমতাবস্থায় এ দেশের মানুষ রোগ সারাতে হাজার বছরে গড়ে উঠা নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতিকে গিলে খেয়েছে। ফলে হাসপাতালের নামে বড় বড় ইমারতগুলো দাঁড়িয়ে আছে মানুষকে উপহাস করার জন্য।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বহুমুখী সংকট সুতীক্ষèভাবে দৃশ্যমান করেছে কোভিড-১৯। এ সব সংকটের কিছু উপাদান আগে থেকেই ছিল। কিছু নতুন যুক্ত হয়েছে। এ দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হচ্ছে জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এই অপ্রতুল বরাদ্দ দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই বরাদ্দ দিয়ে প্রথাগত চাহিদাই মোটানো সম্ভব নয়, মহামারি মোকাবিলা তো অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে ভৌতিক অবকাঠামোর যত বিস্তার ঘটেছে, মানব সম্পদের তত উন্নতি হয়নি। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থাদি ছাড়াই বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠেছে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। অনেকে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আস্থা না থাকায় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন। অন্যান্য পেশাজীবী খাতের মতো চিকিৎসা খাতেরও চরম রাজনীতিকরণ হয়েছে। ফলে দক্ষতা বাড়ানোর চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করতেই ব্যস্ত থাকছেন চিকিৎসকরা। মানসিক ভঙ্গুরতার কারণে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সম্পর্কটি বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় রোগীদের প্রতি অবহেলারও অভিযোগ ওঠে হরহামেশা। সবমিলিয়ে সেবার চেয়ে বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাত।

এমআই



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে