ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আলোচিত দিন ৪ জুন

0
33

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসড়ক ঢাকা টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক। এ মহাসড়কে চলাচল করে ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ উত্তরবঙ্গের প্রায় ২৩টি জেলার যানবাহন। ঈদযাত্রায় এ সড়কে যানজট ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এবারের ঈদযাত্রায় মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশে চারলেনে উন্নীতকরণ আর জেলা পুলিশ প্রশাসনের ব্যাপক তৎপরতায় যানজটের সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে সবকিছুই ঠিকঠাক। রীতিমত যান চলাচলও ছিল স্বাভাবিক। এ সত্ত্বেও আকস্মিক ঈদের আগের দিন ৪ জুন মঙ্গলবার সকালে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজট।

বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে টাঙ্গাইলের পাকুল্লা পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সৃষ্ট ওই যানজট ধারণ করে ভয়াবহ রূপ। এর ফলে প্রায় ১০ ঘণ্টা চরম ভোগান্তির শিকার ঘরমুখো হাজার হাজার মানুষ। যদিও অতিরিক্ত গাড়ির চাপ মোকাবেলায় মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশে চারলেনে উন্নীতকরণ হলেও দুইলেনের বঙ্গবন্ধু সেতু এবং পশ্চিম প্রান্তের সিরাজগঞ্জ সড়ক ব্যবস্থা ওই যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হয় ব্যর্থ।

এরপরও সেতুতে গাড়ি স্থির থাকায় প্রায় ৩ ঘণ্টা বন্ধ হয়ে যায় টোল আদায় কার্যক্রম। সেতুর টোল আদায় ও যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট ওই যানজট টাঙ্গাইল অংশে তীব্র আকার ধারণ করে। ভয়াবহ ওই যানজটে স্থবির হয়ে পরে মহাসড়ক। এ যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর বাম্পার টু বাম্পার আটকে থাকা যানবাহনের যাত্রীরা এ ভোগান্তিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেন। যার প্রতিক্রিয়ায় উত্তেজিত কতিপয় যাত্রী টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিক্রমহাটি এলাকার মহাসড়কে জেলা প্রশাসনের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং আরেকটি গাড়ি ভাঙচুর করেন।

অপরদিকে ভয়াবহ এ যানজটের কবলে পরে গাজীপুর থেকে কুড়িগ্রামগামী এক গর্ভবতী নারী মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্বপাড়ে গোলচত্ত্বর এলাকায় এক কন্যা সন্তান প্রসব করেন। যার আক্ষেপে ওই নবজাতক শিশুর বাবা গাজীপুরের দিনমজুর ও কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হাবিব কণ্যার নাম রাখেন স্মরণী। আবার মহাসড়কের এ যানজট পরিস্থিতিতে আটকে থাকা উত্তরবঙ্গগামী কয়েকজন যাত্রী ব্যাট বল নিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর খেলেন ক্রিকেট। এসব বিষয়গুলো গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপকভাবে প্রচার এবং প্রকাশ হলে ঝড় ওঠে আলোচনা ও সমালোচনার। তবে সরকারি গাড়িতে দেয়া আগুনের ঘটনাসহ যানজট পরিস্থিতি পরিদর্শনে বিকেলেই আসে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। মহাসড়ক পরিদর্শন এসে আগুন দেয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা থেকে ভূঞাপুরগামী আজহারুল ইসলাম তালুকদার নামে এক যাত্রী পরিবারসহ যানজটে আটকা পরেছিলেন টাঙ্গাইলের রাবনা বাইপাস এলাকায়। তিনি বলেন, আমরা একটানা প্রায় ৫ ঘণ্টা যানজটে আটকা ছিলাম। এ সময় আমাদের অদূরেই কিছু মানুষ উত্তেজিত হয়ে টায়ার ও গাড়িতে আগুন দেয়। এ নাশকতা সৃষ্টিকালে তাদের কথাবার্তা এরকম ছিল, আমরা বাড়ি যেতে পারছি না তাই আর কাউকেই যেতেও দেব না।

তিনি আরও বলেন, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের উদ্দেশ্যে আমরাও যাচ্ছি। কষ্ট হলেও কেন এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে হবে? তবে এ ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির ছিল বলেও জানান তিনি। এছাড়াও মঙ্গলবার বেলা সাড়ে এগারটার দিকে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী হানিফ পরিবহনের এক বাস চালক এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বলেন, শুনলাম সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে গাড়ি টানতে পারছে না তাই আমরাও যেতে পারছি না। তবে মহাসড়কে পুলিশের ভূমিকা রয়েছে ভালো।

এছাড়া সোমবার দুপুরে ইকবাল হোসেন নামের এক যাত্রী সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমি চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গায় এসেছি মাত্র ১ ঘণ্টায়। রাস্তায় কোনো যানজট ছিল না। পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। ঈদের আগে বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মহাসড়ক অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। মানুষ স্বস্তিতে যাতায়াত করেছেন। পরিবহন সেক্টরের একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের মতো বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়সহ সিরাজগঞ্জে সড়কে পুলিশ তৎপর থাকলে এ যানজটের মতো কোনো ঘটনা ঘটতো না।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) এর বঙ্গবন্ধু সেতুর এলাকার নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আহসানুল কবির পাভেল জানান, ৪ জুন সকাল ৬টা ৫০ থেকে ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত আমরা টোল আদায় করতে পারি নাই। কারণ অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সিরাজগঞ্জ এলাকায় গাড়ি পাস হচ্ছিল না। সেতুর উপর গাড়ি স্থির ছিল। তিনি আরো বলেন, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে আমি সন্দিহান।

বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা তখন ডিউটিতে ছিলাম। সেতুর পশ্চিম প্রান্ত, সিরাজগঞ্জ এলাকার কড্ডার মোড়, হাটিকমরুল ও নলকা ব্রিজে যানজটের কারণে আমাদের পূর্ব প্রান্তেও তীব্র যানজট লাগে। কারণ পূর্বপ্রান্তের গাড়িগুলো পশ্চিমপ্রান্তে ঢুকতে পারছিল না।

বঙ্গবন্ধুু সেতু কপক্ষ জানায়, স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন সেতু দিয় ১৪-১৫ হাজার যানবাহন পাড়াপাড় হয়ে থাকে। কিন্তু এবারের ঈদে সেটা ২ থেকে ৩ গুন বেড়ে গেছে। টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান মনির বলেন, সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেতু দিয়ে ৩৫ হাজার ২৭১টি যান পাড়াপাড় হয়েছে। আর টোল আদায় হয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ৫ হাজার ৩৭০ টাকা। যা অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, ঈদযাত্রার যানজট নিরসন ও মহাসড়কে যাতায়াতকারীদের নিরাপত্তার জন্য টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের ৭ শতাধিক সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। ঈদের পুরো সময় মহাসড়ক স্বাভাবিক ছিল। তবে ৪ জুন ভোর থেকে অতিরিক্ত গাড়ির চাপে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যানবাহন অতিক্রম করতে না পারায় এবং সিরাজগঞ্জ এলাকায় পুলিশের জোরালো তৎপরতা পালনে ব্যর্থ হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে ওই যানজটের সৃষ্টি হয়। সেই যানজট টাঙ্গাইল অংশে ছড়িয়ে পরায় ভোগান্তির শিকার হন অসংখ্য মানুষ। তবে যানজটের সময় গাড়ি পোড়ানোর ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। এ ঘটনায় দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে