মধুপুরে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের রংচুগালা উৎসব

0
18

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক : মধুপুরে একসময় সাংসারেক গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা জুম চাষ করত। জুম চাষকে কেন্দ্র করে রংচুগালা ও ওয়ানগালা উৎসব হয়। এখন আর জুম চাষ হয় না। জুম চাষ না হলেও কৃষি ফসল উৎপাদনে মধুপুর গরাঞ্চল প্রসিদ্ধ। ধান, আলু, কচু, পেঁপে কুমড়া, বাঙ্গি, মিষ্টি কুমড়া, কাসাবা আলু, শিম, লাউ, আনারস, কলাসহ নানা কৃষি ফসল উৎপাদনে এ এলাকা অনেকটা এগিয়ে আছে। এসব কৃষি ফসলী সাংসারিক গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা জুমে চাষ করতো। জুম চাষকে কেন্দ্র করে রংচুগালা প্রতি বছরের ন্যায় এবারো মধুপুর বনাঞ্চলে শোলাকুড়ি ইউনিয়নের লালমাটি অধ্যুষিত শালবনের পাশে ঐতিহ্যবাহী চুনিয়া গ্রামে পালন করা হয় রংচুগালা।

শুক্রবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে চুনিয়া গ্রামে সাংসারেক গারো প্রথা অনুযায়ী এ উৎসব পালনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে নিয়ম অনুযায়ী এ উৎসব পালনে মেতে উঠে।

সরেজমিনে, মধুপুর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে দোখলা জাতীয় উদ্যানের পাশে চুনিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় রংচুগালা উৎসব। উৎসবকে ঘিরে চুনিয়া গ্রামের গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা সামাজিকভাবে প্রতি বাড়ি বাড়ি গিয়ে উৎসবটি পালন করছেন।

রংচুগালার নিয়ম অনুযায়ী অশুভ ঘটনা মুছে ফেলতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন। এছাড়া আদূরী, রাং, বলথং, নাথুক, রাংখং ও ফার্ম বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখা যায়। বাড়ির উঠানে বা আঙ্গিনায় মাদুরী, ব্রেঞ্চ, চেয়ার, চট বিছিয়ে একত্রিত হয়ে গোল হয়ে বসে চু পানের মধ্য দিয়ে উৎসবটি মুখরিত হয়ে উঠে। এ সমাজের নকমা (গ্রামপ্রধান) চুনিয়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে রংচুগালার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দেন। তার তারিখ মতই এ রংচু গালা পালন করে চুনিয়া গ্রামের গারো সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা। সাংসারেক গারোদের শস্য দেবতা মিশি শালজংকে তুষ্টির জন্য এ উৎসব তারা প্রতি বছর সামাজিকভাবে পালন করে।

চুনিয়া গ্রামের খনা নকরেক (৪৫) জানান, আমাদের পূর্ব পুরুষদের জুম চাষকে কেন্দ্র করেই এ রংচু গালা পালন করা হত। আমাদের সাংসারেক গারোদের প্রথা অনুযায়ী আমরাও এ উৎসবটি সামাজিকভাবে প্রতি বছর পালন করে থাকি। আমাদের আগামী প্রজন্ম আমাদের মতো উ উৎসবটি পালন করে সাংসারেক গারোদের ঐতিহ্য ধরে রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা তার।

খয়ওনি মৃ (৬০) জানান, আমি নকমার মেয়ে। একসময় লালমাটির এ অঞ্চলে জুম চাষে চালকুমড়া, কচু, আদা, পেপে, আলু, ধানসহ নানা কৃষি ফসল চাষ হতো। কালের পরিক্রমায় জুম চাষ এখন আর হয় না। জুম চাষ না হলেও জুম চাষ ও আমাদের গারোদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সমাজের অশুভ শক্তি দূরীকরণে কৃষি ফসল খাওয়ার আগে আমরা প্রতি বছর এ রংচুগালা উৎসবটি পালন করে থাকি।

প্রিয় মৃ (৬০) জানান, এ উৎসবকে কেন্দ্র করে আমাদের গ্রামের নকমা বা সংনকমা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উৎসবের দিনক্ষণ ও প্রস্তুতি নেওয়ার জানান দেন। তারপরে আমরা বাড়ি বাড়ি প্রথা অনুযায়ী চু রান্না করি। রংচুগালায় অংশগ্রহণকারীদের সন্তুষ্টির জন্য চু ও মুরগীর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করি। আদি আমল থেকে শুরু করে এ প্রথা চলে আসছে, ভবিষ্যতেও পরবর্তী প্রজন্ম এ প্রথা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।

বাবুল দারু বলেন, সমাজের সকল অকল্যাণ, অসামাজিক কর্মকা-, কুসংস্কার মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে আগামী দিনগুলো শুভ ও কল্যাণের মধ্য দিয়ে কাটানোর প্রত্যাশায় আমরা এ উৎসব পালন করে থাকি। মিশি শালজং দেবতাকে সন্তুষ্টির জন্য রংচুগালা পালন।

এ ব্যাপারে মধুপুর ট্রাইবাল ওয়েলফেরার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মি. উইলিয়াম দাজেল বলেন, একসময় মধুপুরে জুম চাষ হতো। জুম চাষকে কেন্দ্র করে আমরা নানা পার্বন পালন করতাম। এখন জুম চাষ না থাকলেও পার্বনগুলো রয়ে গেছে। পার্বনগুলোর একটি রংচুগালা। রংচুগালা হচ্ছে ওয়ানগালার যত কৃষি ফসল রংচুগালা না করে আমরা খেতে পারিনা। প্রবাদমতে রংচুগালা না করে শাকসবজি বা কৃষি ফসল খেলে শালজং দেবতা অসন্তুষ্ট হন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে