মুসলমানদের হত্যা করতে গুলি চালাচ্ছে উত্তর প্রদেশের পুলিশ; প্রতিবেদন

0
25

জানুয়ারি ২৭, ২০২০ । মুসলিম বিশ্ব ডেস্ক

ভারতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা মিলে দেশটির উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের পুলিশের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ‘নির্বিচারে হত্যা করার’ একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

দেশের প্রায় ৩০টি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই ছাত্রছাত্রীরা গত সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশের ১৫টি শহর ও জনপদে ঘুরে ঘুরে এই রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে।

ওই রাজ্যে মুসলিম বিরোধী নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ইতিমধ্যেই পুলিশের হাতে অন্তত ২৩জন হত্যার শিকার হয়েছেন।

বুধবার দিল্লিতে ওই রিপোর্ট প্রকাশ করার সময় ওই ছাত্রছাত্রীরা বলেন, পুলিশের গুলিচালনার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করা হয়েছে প্রান্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে – অনেক ক্ষেত্রে নাবালকদেরও। এখনও সেখানে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে, মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন” বলেও তারা জানিয়েছেন।

মুসলিম বিরোধী নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার। ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গত ১৯ ডিসেম্বর বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘বদলা’ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

তার পর দিন থেকেই তার রাজ্যের পুলিশ বেছে বেছে মুসলমানদের ওপর হামলা চালাতে শুরু করে বলে ওই রাজ্যে সরেজমিনে তদন্তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন।

উত্তরপ্রদেশে শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধানী দলে ছিলেন দিল্লি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী থৃতি দাস।
থৃতি বিবিসিকে বলছিলেন, “আমরা চারটে দলে ভাগ হয়ে মোট পনেরোটা জায়গায় ঘুরেছি, আর সবাই কিন্তু এই হামলাগুলোর মধ্যে একটা ‘কমন প্যাটার্ন’ লক্ষ্য করেছি। প্রায় প্রতিটা হামলাই হয়েছে ২০শে ডিসেম্বর, অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কারের ঠিক পরদিন – আর সবগুলোই বেলা তিনটে থেকে চারটের মধ্যে।

“সে সময় মানুষ সদ্য দুপুরের নামাজ সেরে মসজিদ থেকে বেরিয়েছেন। তারা কেউ কেউ হয়তো সংগঠিত কোনও পদযাত্রায় সামিল হচ্ছিলেন, অথবা শান্তিপূর্ণ মিছিল করে এগোচ্ছিলেন। তখনই পুলিশ তাদের বাধা দিয়ে চুপচাপ বসতে বলে। এরপরই শুরু হয়ে যায় বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জ। এমনকি আমাদের হাতে আসা ভিডিওতে পুলিশ বিনা অপরাধে তাদের গুলি চালাতেও দেখা গেছে।”

“আমি তো বলব উত্তরপ্রদেশের পুলিশ নির্দিষ্টভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিশানা করে গুলি চালিয়েছে! যেখানে ভিক্টিম মুসলমানরা গরিব মহল্লার বাসিন্দা, বস্তিবাসী এবং দিন-এনে-দিন-খাওয়া মানুষজন!” বলছিলেন থৃতি।

বিজনৌর-কানপুরে গিয়েছিলেন আর একটি দলের সদস্য আকাশ মিশ্রা, যিনি দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মাস কমিউনিকেশনের ছাত্র।

আকাশ বিবিসিকে বলছিলেন, “পুলিশ যেখানেই গুলি চালিয়েছে কোথাও কোমরের নিচে চালায়নি – সব জায়গায় নিশানা করেছে সোজা পেটে, মাথায় বা বুকে। সব জায়গাতেই তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের লোকজন।”

আর এই জুলুম ও নির্যাতন এখনও চলছে অব্যাহতভাবে – মুসলিম মহল্লায় পুলিশ রাতবিরেতেও হানা দিচ্ছে।

অনুসন্ধানী দলের সদস্য, দিল্লির ছাত্রী অনন্যা ভরদ্বাজ বলছিলেন, “মানুষ এতটাই ভয় পেয়েছে যে আহতদের পরিবার আমাদেরও দরজা খুলে দিতে চাইছিল না।”

কানপুরে বিক্ষোভকারীদের তাড়া করে যাচ্ছে পুলিশ। ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯
“অনেকেই তারা ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।”

“পুলিশ এখনও মুসলমানদের বাড়িতে ঢুকে পড়ছে ছাদ টপকে, দরজায় বাড়ি মেরে – এমন কী মধ্যরাতের পরেও। মানুষকে তারা ঘুমোতে পর্যন্ত দিচ্ছে না”, বলছিলেন অনন্যা।

এই রিপোর্ট প্রকাশের অনুষ্ঠানে ছিলেন ভারতের নামী সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট পামেলা ফিলিপোস।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো যখন এবিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব, তখন এই ছাত্রছাত্রীরাই জাতির বিবেকের কাজটি করল।”

“তারা দেখিয়ে দিল, উত্তরপ্রদেশ কীভাবে ভারতের ‘কিলিং ফিল্ডস’ বা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে – যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করা হচ্ছে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে, যাদের প্রতিবাদ করার কোনও শক্তিই নেই!”

সূত্র: বিবিসি



একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে