মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইসলামফোবিয়া

0
30

বারাক ওবামার ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পর আমেরিকার অনেকে আশা করেছিলেন যে মুসলিমদের জীবনকে অপরাধী করে তোলার বুশ প্রশাসনের নীতির অবসান হবে। কিন্তু ওবামার দুই মেয়াদ আমেরিকান ইসলামফোবিয়ার সবচেয়ে বিপর্যয়কর চ্যালেঞ্জে (যুদ্ধ করা, নজরদারি চালানো ও অভিবাসন নীতি) সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। বরং তার প্রেসিডেন্ট আমলে ইসলামফোবিয়ার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে।

ওবামা ইউএস প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট নবায়ন ও সম্প্রসারণ করেন। তিনি মার্কিন হামলায় নিহত মুসলিম বেসামরিক লোকজনকে ‘শত্রু যোদ্ধা’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেন। তিনি সাধারণ মুসলিমদের ওপর সফট-পুলিশিং করার জন্য প্রণয়ন করেন কাউন্টারিং ভায়োল্যান্ট এক্সট্রিমিজম আইন।

ওবামা কেবল বুশ আমলের ইসলামফোবিয়ার উত্তরসূরি হননি, সেইসাথে তিনি তা সক্রিয়ভাবে সম্প্রসারিতও করেন। তার নীতির জের ধরে সারা দুনিয়ায় অগণিত সামরিক ডিটেনশন কেন্দ্র গড়ে ওঠে।

আমেরিকান ভোটারদেরকে ১২ বছর পর আবারো ঘোষিত ইসলামফোবিক রিপাবলিকান প্রশাসনের মুখোমুখি হতে বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমিরকান ইসলামফোবিয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের জয়ের অর্থ কী হবে?

যুদ্ধ: আমেরিকান ইসলামফোবিয়ার ভিত্তি

ইসলামফোবিয়াকে অনেক সময় ভুলবশত মুসলিমবিরোধী গোড়ামি হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে ইসলামফোবিয়ার আরো ভালো সংজ্ঞা হতে পারে পরিকল্পিত বর্ণবাদ অর্থাৎ ব্যক্তি মনোভাবের কোনো বিষয় এতে নেই।

অর্থাৎ মুসলিমদের হয়রানি বা নেতিবাচক মিডিয়া চিত্রণ ইসলামফোবিয়ার লক্ষণ, এর মূল নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে।

সংজ্ঞটি এভাবে দেয়া হলে ওবামা রমজানের ডিনারের আয়োজন করলেন কিনা বা হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে প্রধান বক্তা হিসেবে কোনো মুসলিমকে সুযোগ দিলেন কিনা তা কোনো বিষয়ই হয় না। এমনকি জর্জ ডব্লিউ বুশ আমেরিকানদেরকে তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের ভালোবাসার আহ্বানেও কোনো গুরুত্ব থাকে না। আমেরিকার সাম্রাজ্য বিনির্মাণের সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, আমেরিকান রাজনৈতিক এলিটরা পুরোদস্তুর ইসলামফোবিকই রয়ে গেছেন।

আর এই বিষয়টি মাথায় রাখলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট ব্যালটের উভয় দিকেই আছে আমেরিকান ইসলামফোবিয়ার সম্প্রসারণের একটি চিত্র।

আমেরিকা বিরামহীনভাবে ৯/১১-এর পর মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগকে ব্যবহার করেছে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালানোর জন্য। পুরো মুসলিমবিশ্বকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করে হামলা চালানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে।

ইরাকের সাথে আমেরিকার ৯/১১-কে জড়িত করার ব্যাপারে এতই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল যে ৯/১১ হামলায় মারা যাওয়া এক এয়ার মার্শালের নামে ইরাকে এক আটককেন্দ্রের নামকরণ করা হয়। এছাড়া প্রতিরক্ষা দফতর ৯/১১-এ মারা যাওয়া এক ব্যক্তির নামে বানানো বোমা ২০০৩ সালে ইরাকি জনসাধারণের ওপর ফেলা হয়।

সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, এই কৌশলে কাজ হয়েছে। ৯/১১-এর পর জন্মগ্রহণকারীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি ৫ জনের একজন বিশ্বাস করে যে হামলার জন্য দায়ী ছিলেন সাদ্দাম হোসেন।

ইসরাইল ও আমেরিকান ইসলামফোবিয়া

আমেরিকান ইসলামফোবিয়ার স্থায়ী প্রতীক হলো ইসরাইলের প্রতি অবিচল সমর্থন। ইসরাইলি অস্ত্র ভাণ্ডারের অন্যতম অস্ত্র হলো আমেরিকার তহবিলে সৃষ্ট একটি অস্ত্র। তা হলো ইসলামফোবিয়া।

আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইসলামফোবিয়া হলো ইসরাইলের সমরবাদকে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠে সমর্থন দেয়া।

ট্রাম্পের আমলে ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন আগের মতোই রয়েছে। তিনি তার প্রথম মেয়াদে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়ে গেছেন। ট্রাম্পই ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেন।

হিন্দুত্ববাদ ও আমেরিকা-ভারত জোট

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে ট্রাম্পের মিত্রতা আসলে তাদের ইসলামফোবিয়ারই প্রকাশ। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় বিষয়টি সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা গেছে। ওই সফরের সময়ই রাজধানী দিল্লীর রাজপথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। আর তাকে ভারতে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের বাস্তব রূপ ধরা পড়ে।

ডেমোক্র্যাটিকরা কমলা হ্যারিসকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করছে, এটি আসলে মোদির হিন্দুত্বাবাদী মতাদর্শের প্রতি তাদের পরোক্ষ সমর্থন প্রদান।

ভোটের সুযোগ সামান্যই

মুসলিম আমেরিকানরা নিশ্চিতভাবেই বাইডেন/কমলাকেই ভোট দেবে বলে মনে হচ্ছে। তবে তাতে বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন হবে সামান্যই। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ইসলামফোবিয়া ভালোভাবেই বিরাজ করবে। বাইডেনের অধীনে কোনো কিছুই পরিবর্তন হবে না।

তবে যারা এই অচলাবস্থায় হতাশ হয়ে পড়ছে, তাদের জন্য বার্তা হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থার বাইরে কিছু হচ্ছে। শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে আমেরিকানদের প্রতি। অবশ্য রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটিক- উভয়পক্ষই তা চায় না। কিন্তু এখন সময় এসেছে, এই অব্যবস্থাপনাকে তুলে ধরার।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ও আল জাজিরা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে