টাঙ্গাইল জেলার কৃতি সন্তান প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ

0
122

প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম (১৮৯৪-১৯৭৮) শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক। টাঙ্গাইল জেলার শাবাজ নগর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৯১২ সালে তিনি পিংনা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স, ১৯১৪ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এফএ এবং কলকাতার সেন্ট পলস সিএম কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ (১৯১৬) পাস করেন। পরে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি আইন বিষয়েও ডিগ্রি (১৯১৮) লাভ করেন।

ইব্রাহীম খাঁ ১৯১৯ সালে করটিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খাঁ পন্নীর অর্থসাহায্যে করটিয়া সাদত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে ইব্রাহীম খাঁ এর প্রথম প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। মাঝে কিছুকাল তিনি ময়মনসিংহে ওকালতি করেন। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে (১৯২০-১৯২২) সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইব্রাহীম খাঁ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি একাধিকবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য এবং ১৯৫৩ সালে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭-১৯৭১ পর্যন্ত তিনি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৯৪৮-১৯৫২ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি ছিলেন।

একজন কৃতবিদ্য লেখক হিসেবেও ইব্রাহীম খাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি বিভিন্ন লেখায় মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের কথা বলেছেন। নাটক, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনী ও স্মৃতিকথা মিলে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা ২১টি। সেগুলির মধ্যে কামাল পাশা (১৯২৭), আনোয়ার পাশা (১৯৩৯), ঋণ পরিশোধ (১৯৫৫), আলু বোখরা (১৯৬০), ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র (১৯৫৪), বাতায়ন (১৯৬৭), ব্যাঘ্র মামা (১৯৫১) এবং বেদুঈনদের দেশে (১৯৫৬) প্রধান। তাঁর স্মৃতিকথা বাতায়ন সমকালের মুসলিম সমাজের একটি বিশবস্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত।

তিনি ব্রিটিশ আমলে ‘খান সাহেব’ ও ‘খান বাহাদুর’ এবং পাকিস্তান আমলে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি লাভ করেন। নাটকে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৩) এবং সাহিত্যের জন্য একুশে পদক (১৯৭৬) লাভ করেন। ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতা-সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালি হিন্দু সমাজে ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনা-লগ্নেই নবজাগরণের উন্মেষ ঘটে। বাঙালি মুসলিম সমাজে এ নবজাগরণের সূচনা হয় এর অর্ধশতাব্দি কাল পরে। কারণ পলাশি যুদ্ধের পর ইংরাজদের বৈরি আচরণের ফলে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতার প্রতি বিদ্বেষভাব ছিল।

এ কারণে তারা ইংরাজি শিক্ষা লাভে অগ্রসর হয়েছে অনেক পরে। মূলত ১৮৫৭ সনে মহাবিদ্রোহ তথা সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণের পর মুসলমানগণ নিরুপায় হয়ে ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে ইংরাজি শিক্ষা লাভে আগ্রহ প্রদর্শন করে। ১৮৬৩ সনে কলকাতায় ‘মোহামেডান লিটার‌্যারি সোসাইটি’ গঠনের পর ভারতীয় মুসলমানগণ ইংরাজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হন। এক্ষেত্রে দানবীর হাজী মোহাম্মদ মুহসীন, স্যার সৈয়দ আহমদ (১৮১৭-৯৮), নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-৯৩), স্যার সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) প্রমুখের অবদান ছিল অসামান্য।

এ নবজাগরণের ধারায় আমরা পরবর্তীতে যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন- মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২), মোহাম্মদ কাজেম অল কোরেশী ওরফে কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫১), শেখ আব্দুর রহীম (১৮৫৯-১৯৩১), শেখ রেয়াজ অল দীন মাশ্হাদী (১৮৬০-১৯১৯), কবি মোজ্জামেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৬০-১৯২৫), মুনসী মহম্মদ মেহেরউল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭), মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদ (১৮৬২-১৯৩৩), মওলানা মনিরুজ্জামন ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৯), আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭৯-১৯৫৩) সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী (১৮৭৯-১৯৩১), বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), কবি শাহাদৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩),প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮) কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৫-১৯৬৪), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮), আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখ। ইব্রাহিম খাঁ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে প্রবন্ধকার, নাট্যকার, গদ্য-লেখক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজ-সংস্কারক হিসাবে সুপরিচিত। ১৮৯৪ সনের ২ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলার বিরামদী গ্রামে তিনি এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শাহবাজ খাঁ এবং মাতার নাম রতন খানম। তিনি ১৯১২ সনে পিংনা হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৯১৪ সনে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফ. এ, ১৯১৬ সনে কলকাতা সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরাজিতে বি.এ অনার্স ও ১৯১৯ সনে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে এম.এ পাশ করেন। টাঙ্গাইলের করটিয়া ইংরাজি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯২০ সনে তিনি ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগদান করেন। অতঃপর তিনি অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে (১৯২০-২২) সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর চেষ্টায় করটিয়া ইংরাজি উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয় বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ১৯২৪ সনে তিনি আইন পাশ করে শিক্ষকতা পেশা পরিত্যাগ করে ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। ঐ সময় তিনি ময়মনসিংহে ‘আল হেলাল সাহিত্য সমিতি’ গঠন করে তরুণদেরকে সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পান। উক্ত সাহিত্য সমিতি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম বিষয়ক রচনা আহবান করত এবং প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তিনটি ভাল রচনার জন্য পুরস্কার প্রদান করত। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারার প্রবর্তন ও তরুণ সাহিত্যিক সৃষ্টিতে প্রেরণা দান। (দ্র. ‘‘বিবিধ প্রসঙ্গ’’, ‘সাম্যবাদী’, ৩য় বর্ষ-২য় সংখ্যা, ফাল্গুন, ১৩৩১, পৃ. ৬)। প্রথম বছরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এ রচনা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন তৎকালিন চট্টগ্রাম কলেজের মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ এনামুল হক (পরবর্তীতে ডক্টর) এবং রৌপ্যপদক পেয়েছিলেন হুগলী মাদরাসার ছাত্র মুহাম্মদ মনসুর ও ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী মোসাম্মত জোবেদা খাতুন। ওকালতি পেশায় সততা বজায় রেখে কাজ করা অসম্ভব বিবেচনা করে ইব্রাহীম খাঁ দু’বছর পর আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করে ১৯২৬ সনে করটিয়ার জমিদার দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর অর্থ সাহায্যে করটিয়া সা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত কলেজে তিনি প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। তৎকালিন যুক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদ অলংকৃত করেন। পরবর্তীতে উক্ত কলেজ তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা ও দক্ষ পরিচালনায় তদানীন্তন যুক্ত বাংলায় এক ঐতিহ্যবাহী নামকরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এক সময় উক্ত কলেজ ‘বাংলার আলীগড়’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। এ কারণে সমসাময়িককালে তাঁর নামের সাথে ‘প্রিন্সিপাল’ শব্দটি অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। তিনি এ নামেই বিশেষভাবে পরিচিত হন। শিক্ষাব্রতী হিসাবে তাঁর অবদান সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ডক্টর সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন : ‘‘বাংলার উচ্চ শিক্ষাব্রতী মুসলমান সমাজে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণা স্বরূপ। তাঁর প্রেরণা ও উৎসাহে অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে শিক্ষার আলোতে ছুটে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে এ কালের বহু মুসলমান। তাই তাদের চেতনায় প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ অমরত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মুসলিম সমাজে সকলের আগে প্রিন্সিপাল হয়ে যে অসাধ্য তিনি সাধন করেছেন তার জন্য দেশবাসী ‘প্রিন্সিপাল’ শব্দটি অতিশ্রদ্ধাভরে তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।’’ ১৯৩৭ সনে ইব্রাহীম খাঁ কংগ্রেস পরিত্যাগ করে ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৪৬ সনে ইব্রাহীম খাঁ মুসলিম লীগের টিকিটে মধুপুর-গোলাপপুর কেন্দ্র থেকে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী করটিয়া সা’দত কলেজের অধ্যক্ষ পদে সুদীর্ঘ ২২ বছর দায়িত্ব পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি প্রাদেশিক প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি (১৯৪৭-৭১) ও ১৯৪৮-৫২ পর্যন্ত তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সনে তিনি পাকিস্তান গণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময় তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসাবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে যোগদান করেন। এ উপলক্ষে তিনি তুরস্ক, মিশর, লেবানন, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, চীন ইত্যাদি দেশ পরিভ্রমণ করেন। আজীবন শিক্ষাব্রতী হিসাবে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ বাঙালি মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো জ্বালাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অধঃপতিত মুসলিম জাতি তখন অজ্ঞানতায় নিমজ্জিত ছিল। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ব্যতীত কোন জাতির উন্নতি আশা করা যায় না। তাই ইব্রাহীম খাঁ নিজে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে আজীবন শিক্ষাদান কাজে নিরত থাকেন। পাঠ্য বই রচনা ও শিক্ষামূলক নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গ্রন্থাদি রচনা করেন। শিক্ষার উন্নয়নে তিনি অসংখ্য সভা-সেমিনারে যোগদান করেন। বিভিন্ন স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভুয়াপুর হাই স্কুল, ভুয়াপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভুয়াপুর কলেজ, করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ‘জাদু সম্রাট’ পি.সি. রায় গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে তাঁর শিক্ষক ইব্রাহীম খাঁকে ‘হৃদয় সম্রাট’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম হিসাবে ইসলামের মধ্যেই মুসলমানদের সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন এবং এ লক্ষ্যে সারা জীবন কাজ করেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। তৎকালিন ভারতের বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁকে একবার জার্মানি ও রাশিয়ায় পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাংবাদিকতা ও কমিউনিজম অধ্যয়নের জন্য। তিনি সবিনয়ে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন ঃ ‘‘বলশেভিকরা শোষক আর জালিমের সঙ্গে আল্লাহকে আক্রমণ করেছে, ধার্মিক বলে আমার কোনো দাবি নেই, নেই অহঙ্কার কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর পথই ব্যথিত দরিদ্র মানুষের মুক্তির পথ। কাজেই আল্লাহহীন পথ আমার পথ নয়।’’ বহুবিধ কাজের মধ্যে ইব্রাহীম খাঁর প্রধান পরিচয় হলো লেখক হিসাবে। এক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিচিত্র ও বিশাল। তিনি একাধারে প্রবন্ধ, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের তালিকা নিম্নরূপ- নাটকঃ কামাল পাশা (১৩৩৪), আনোয়ার পাশা (১৩৩৭), ঋণ পরিশোধ (১৯৫৫), ভিস্তি বাদশা (১৯৫৭), কাফেলা। উপন্যাস : বৌ বেগম (১৯৫৮)। গল্পগ্রন্থ : আলু বোখরা (১৯৬০), উস্তাদ (১৯৬৭), দাদুর আসর (১৯৭১), মানুষ, হিরকহার। স্মৃতিকথা : বাতায়ন (১৩৭৪)। ভ্রমণ কাহিনী : ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র (১৯৫৪), নয়া চীনে এক চক্কর, পাকিস্তানের পথে-ঘাটে। শিশু সাহিত্য : ব্যাঘ্র মামা (১৯৫১), শিয়াল পন্ডিত (১৯৫২), নিজাম ডাকাত (১৯৫০), বেদুঈনদের দেশে (১৯৫৬), ইতিহাসের আগের মানুষ (১৯৬১), গল্পে ফজলুল হক (১৯৭৭), ছোটদের মহানবী, ছেলেদের শাহনামা, ছোটদের নজরুল, গুলবাগিচা, নবী জীবনের ঝান্ডা বহিল যারা, তুর্কী উপকথা, নীল হরিণ, সোহরাব রোস্তম। ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ : মহানবী মুহাম্মদ, ইসলাম সোপান, ছোটদের মিলাদুন্নবী। শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতির মর্মকথা, ইসলামের মর্মকথা, নীতিকাহিনী ইত্যাদি। ইব্রাহীম খাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ১১৮টি। এর মধ্যে ১৮টি অনুবাদ গ্রন্থ, ইংরাজিতে লেখা গ্রন্থের সংখ্যা ১২ এবং বাংলা ভাষায় রচিত মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা মোট ৮৮টি। ইংরাজিতে লেখা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এনেকডোটস ফ্রম ইসলাম’ একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও লেখক ইব্রাহীম খাঁর একটি সাধারণ পরিচয় হলো তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন সমাজ-সচেতন, জনদরদী, মানব কল্যাণকামী ও সর্বোপরি অধঃপতিত মুসলিম সমাজের নবজাগরণে বিশ্বাসী এক মহৎ প্রাণের মানুষ। তাঁর সাহিত্যে সর্বত্র এ বিশ্বাসের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে তাঁর লেখাকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করা সম্ভব নয়। তাঁর সাহিত্যের ভাষা অতি সহজ, সরল ও সকল শ্রেণির মানুষের নিকট বোধগম্য। তাঁর সাহিত্যের বিষয় ও বিভিন্ন চরিত্রও পরিচিত সমাজ ও পরিপার্শ্ব জগত থেকে সংগৃহীত। সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের চিত্র তিনি অতিশয় আন্তরিকতার সাথে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও অনাচার-কুসংস্কারের বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন, মূলত সেগুলোর যুক্তিযুক্ত সমাধান বাতলে দেয়ার জন্য। অধঃপতিত-বঞ্চিত মুসলিম সমাজের উন্নতিকল্পে তিনি নবজাগরণের প্রেরণায় তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। সাহিত্য-সাধনা তাঁর নিকট কোন পেশা বা নেশা ছিল না। মূলত সমাজের প্রতি অসীম দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ইব্রাহীম খাঁর সাহিত্যের ভাষা সহজ, সরল ও সকলের বোধগম্য হওয়ার ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গী ছিল।

তিনি ১৯৬৮ সনে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য সম্মেলনে বলেন ঃ ‘‘একটি হরফ জ্ঞান নেই এমন লাখ লাখ লোক নয়, কোটি কোটি লোক বাংলার পুঁথিপুঞ্জ থেকে পেয়ে আসছে সাহিত্যের রস, চিত্তের আনন্দ, প্রাণের খোরাক। আমরা জনগণের সাহিত্য জনগণের জন্য ফিরিয়ে দিতে চাই, পুঁথি সাহিত্য চাই না, আমরা চাই সহজ-সুন্দর ভাষায় লিখিত জনগণের উপযোগী ভাষা। অকারণে হরফের জুলুম অকারণে বানানের জুলুম এ আমরা বরদাশত করতে চাই না।’’ ইব্রাহীম খাঁর রচিত নাটক ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা। তাঁর রচিত ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ নাটকে তুরস্কের নবজন্মের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সমাজে নবজাগরণের প্রেরণা সৃষ্টি করাই তাঁর মূল্য লক্ষ্য। তাঁর রচিত ‘ঋণ পরিশোধ’, ‘ভিস্তি বাদশা’, ‘কাফেলা’ প্রভৃতি নাটক সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা।

এসব নাটকে আমাদের সমাজে যে সব সমস্যা, অনাচার ও কুসংস্কার বিরাজমান তার বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। লেখক সে সব সমস্যার সমাধানও বাতলে দিয়েছেন, সামাজিক অনাচার ও কুসংস্কার দূরীকরণার্থে তিনি নাটকের পাত্র-পাত্রীর সংলাপ, ঘটনা ও আখ্যানের বিন্যাস ঘটিয়েছেন। তাঁর রচিত সামাজিক নাটকের বিষয়বস্তু, চরিত্র ইত্যাদি সবকিছুই চলমান সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবন থেকে সংগৃহীত। নাটকের বিভিন্ন ঘটনা, সংলাপ ও চরিত্রের বর্ণনায় লেখক অত্যন্ত সহজ, সরল, অনেক ক্ষেত্রে হাস্যতরল ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ও ভঙ্গী ব্যবহার করেছেন। উপন্যাস ও গল্প রচনায় ইব্রাহিম খাঁ সমাজের বিভিন্ন বিষয় ও জীবনের বিচিত্র দিক তুলে ধরেছেন। এখানেও মূলত সমাজ-সেবা ও সমাজ-সংস্কারই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁর গল্প-উপন্যাসের ভাষা সহজ, সরল ও রসঘন। তাঁর গল্প বলার আয়েশী ভঙ্গী সকলকে মুগ্ধ করে। তাই সকল শ্রেণির পাঠকের নিকট তা সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ছোটদের জন্য তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা অনেক। এগুলো অধিকাংশই পাঠ্য-পুস্তক হিসাবে রচিত। সেকালে লেখকের সংখ্যা ছিল কম, ভাল পাঠ্য-পুস্তকেরও নিদারুণ অভাব ছিল। বিশেষত শিশু-কিশোরদের ভাল ভাল কথা, উপদেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে তাদের চরিত্র গঠন ও সাহসী মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই ইব্রাহীম খাঁ এ সকল গ্রন্থ রচনায় সচেষ্ট হন। শিশু-কিশোরদের উপযোগী গ্রন্থে শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে সহজ, সরল ভঙ্গীতে হাস্য-কৌতুকের মাধ্যমে তিনি অনায়াসে তাদের উপযোগী মনোগ্রাহী গ্রন্থ রচনা করেন।

বাংলা শিশু-সাহিত্য শাখায় তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর শিক্ষা বিষয়ক রচনায় শিক্ষাবিদ ইব্রাহীম খাঁর চিন্তা-চেতনা, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার গলদ ও তা নিরসনের উপায়-নিরূপণ সম্পর্কে তিনি মূল্যবান পরামর্শ দান করেছেন। ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি ইসলামের মূল আদর্শ ও শিক্ষা সম্পর্কে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা পেশ করেছেন। শিক্ষিত সমাজকে বিশেষত তরুণদেরকে ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান দানের উদ্দেশ্যেই তিনি এসকল গ্রন্থ রচনা করেন। ভ্রমণ কাহিনীমূলক রচনায় তিনি পৃথিবীর যে সব দেশ সফর করেছেন, তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে সে সব দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নানা বিষয় রসঘন ও চিত্তাকর্ষকভাবে তুলে ধরেছেন। এসব গ্রন্থ পাঠে বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় অবগত হওয়া যায়। তাঁর স্মৃতিকথামূলক রচনা ‘বাতায়নে’ জীবনের ব্যাপক অভিজ্ঞতার অন্তরঙ্গ বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এটি তাঁর সমকালিন জীবনের এক অবিস্মরণীয় গুরুত্বপূর্ণ দলীল। বাঙালি মুসলিম নবজাগরণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিলগ্নে ইব্রাহীম খাঁর আবির্ভাব। ইসলামের প্রতি অনুরাগ, মুসলমানদের প্রতি দরদ ও মুসলিম সমাজের উন্নয়নে ইব্রাহীম খাঁর আগ্রহ কত গভীর ছিল এবং এ জন্য তিনি কতটা আন্তরিকতা সহকারে চিন্তা-ভাবনা করতেন, কাজী নজরুল ইসলামকে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে তা সুস্পষ্ট হয়। উক্ত চিঠি ১৩৩৪ সনের ভাদ্র সংখ্যা ‘নওরোজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আমাদের সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি চিন্তার ক্ষেত্রে উক্ত চিঠির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। নজরুলের নিকট লেখা ইব্রাহীম খাঁর উপরোক্ত পত্রটি থেকে ইসলামের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা ও মুসলিম সমাজের উন্নয়নে গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগের বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নজরুল ৩ বছর পর এক দীর্ঘ পত্রে এর জবাব দিয়েছিলেন। সে পত্রটি নানা দিক থেকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। নজরুল জীবনের নানা দিক, না বলা দুঃখ-বেদনা ও চিন্তা-চেতনার বিষয় তাতে বর্ণিত হয়েছে। ইব্রাহীম খাঁ তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সময় নানা খেতাব ও পুরস্কার পেয়েছেন। বৃটিশ সরকার তাঁকে প্রথমে ‘খান সাহেব’ ও পরে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। খান সাহেব উপাধি তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেন এবং খান বাহাদুর খেতাব তিনি পরবর্তীতে বৃটিশ সরকারের মুসলিম-বিরোধী মনোভাবের প্রতিবাদে প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৬৩ সনে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তঘমা-এ-কায়দে আযম’ খেতাব প্রদান করেন। ১৯৭১ সনে পাক বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৩ সনে তিনি নাটকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার ও ১৯৭৬ সনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। ১৯৭৭ সনে তিনি ভুয়াপুর ‘সাহিত্য সংসদ’ গঠন করে একুশে পদকের সব অর্থ ও কিছু জমি উক্ত সাহিত্য সংসদে দান করেন। মুসলিম নবজাগরণ, শিক্ষা-সাহিত্য ও সমাজকল্যাণে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে এ মহান ব্যক্তি ১৯৭৮ সনের ২৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে